
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) ও অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। একইসঙ্গে তারা সংঘাতের স্থায়ী সমাধানে আলোচনার তাগিদ দিয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনকারী গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। যুদ্ধের ৪০তম দিনে পৌঁছে বিবদমান পক্ষগুলো হামলা স্থগিত করতে রাজি হয়েছে। আগামী শুক্রবার পাকিস্তানে শুরু হতে যাওয়া আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা এখন তৈরি হয়েছে।
বুধবার ভোররাতে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে খুলে দিতে রাজি হয়, তবেই তিনি হামলা বন্ধ করবেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দুই সপ্তাহের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হবে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ইরানজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। একইসঙ্গে বিশ্বের অনেক নেতা এই অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
সপ্তাহব্যাপী এই সংঘাত প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে জড়িয়ে ফেলেছিল। ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সম্পদ লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পর প্রতিশোধমূলক অভিযান শুরু করে। উপসাগরীয় দেশগুলো অভিযোগ করে যে, এতে বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর হামলা চালানোর পর ২ মার্চ লেবাননও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন করলেও জানিয়েছে, এতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ পাকিস্তান প্রথমে দাবি করেছিল যে যুদ্ধবিরতিতে লেবাননও রয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া:
সৌদি আরব
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুদ্ধবিরতিকে “স্বাগত” জানিয়েছে। তারা অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর সব ধরনের হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে যে, এই যুদ্ধবিরতি “একটি পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই শান্তি প্রক্রিয়ার” দিকে নিয়ে যাবে।
কাতার
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই যুদ্ধবিরতিকে “উত্তেজনা হ্রাসের দিকে প্রাথমিক পদক্ষেপ” হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। তারা অবিলম্বে এর ওপর ভিত্তি করে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং “যুদ্ধবিরতির পূর্ণ প্রতিপালন” ও ইরানের প্রতি “সকল শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ” করার তাগিদ দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতির কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ এক্স-এ লিখেছেন, “যে যুদ্ধ আমরা আন্তরিকভাবে এড়াতে চেয়েছিলাম, সংযুক্ত আরব আমিরাত তাতে বিজয়ী হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্বাসঘাতক আগ্রাসনের মুখে সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষা এবং আমাদের অর্জনসমূহ সুরক্ষিত করার এক মহাকাব্যিক জাতীয় প্রতিরক্ষার মাধ্যমে আমরা জয়লাভ করেছি।” “আজ আমরা আরও বেশি প্রভাব, তীক্ষ্ণতর অন্তর্দৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত ও রূপদান করার আরও দৃঢ় সক্ষমতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি,” যোগ করেন তিনি।
ওমান
ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, “পাকিস্তান ও সকল পক্ষের যুদ্ধ বন্ধের আহ্বানকারী প্রচেষ্টার” প্রশংসা করছে।
মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, “সংকটের গোড়া থেকে নির্মূল করে এই অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটানোর জন্য এখনই প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।”
ইরাক
ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে “গুরুত্বপূর্ণ ও টেকসই সংলাপের” আহ্বান জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, “বিরোধের মূল কারণগুলো সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে গুরুতর সংলাপ শুরু করার মাধ্যমে এই ইতিবাচক পদক্ষেপকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।”
মিশর
মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই যুদ্ধবিরতিকে “আলোচনা, কূটনীতি ও গঠনমূলক সংলাপের পথ প্রশস্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, যুদ্ধবিরতি গড়ে তুলতে হবে “সামরিক অভিযান বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতাকে সম্মান জানানোর” পূর্ণ অঙ্গীকারের ভিত্তিতে।
মিশর পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মিলে অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলেও জানিয়েছে।
তুরস্ক
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার জানিয়েছে, তারা ইরান যুদ্ধে যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানায় এবং ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনাকে সমর্থন করবে। মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধবিরতির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং সকল পক্ষের চুক্তি মেনে চলার ওপর জোর দিয়েছে।
সুদান
সুদানের অন্তর্বর্তীকালীন সার্বভৌমত্ব পরিষদ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে “উত্তেজনা হ্রাসের দিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ” বলে অভিহিত করেছে। পরিষদ বলেছে, এটি “অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে কূটনীতিকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি”।
এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে একটি সংবেদনশীল মুহূর্ত তৈরি করেছে। আগামী শুক্রবার পাকিস্তানে শুরু হওয়া আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি।
সূত্র: আল জাজিরা