
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ উত্তেজনা ও সাম্প্রতিক যুদ্ধপরিস্থিতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত শান্তিচুক্তিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। এক পক্ষ এটিকে যুদ্ধের অবসান ও কূটনৈতিক অগ্রগতি বললেও, অন্য পক্ষের মতে এটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পিছু হটার স্বীকৃতি।
ঘটনার শুরু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিনা উসকানিতে ইরানে হামলা চালায় বলে দাবি করা হয়। ওই হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। একই হামলায় আরও কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা প্রাণ হারান। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন, খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়েই ইরানের শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটেছে এবং তিনি তখন ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ করার আহ্বান জানান।
কিন্তু সাড়ে তিন মাস পর পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নেয়। সোমবার (১৫ জুন) ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও বৈরিতা অবসানের জন্য শান্তিচুক্তির ঘোষণা দেন। এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেই কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসম্যান সেথ মোল্টন বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ চুক্তি। এটি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কাছে আত্মসমর্পণের দলিল।’
চুক্তির শর্তগুলো নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ছাড়ের পথে এগোতে হবে, ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি কমাতে হতে পারে। পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য ইরানকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে, তা মূলত ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর নিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বহু আগ থেকেই বলে আসছে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। ফলে এই প্রতিশ্রুতিকে নতুন কোনো অর্জন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়াও এসেছে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে, যা এখন আবার খুলে দেওয়া হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা ছিল না। বরং দেশটির শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ইরানপন্থি শক্তিগুলোর প্রভাব কমানোও তাদের উদ্দেশ্য ছিল বলে বিভিন্ন সময়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু চুক্তির বর্তমান রূপরেখা সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে।
চুক্তি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প এক পর্যায়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ এবং পরে ‘বিচার-বিবেচনাহীন ব্যক্তি’ বলেও অভিহিত করেন।
একই সময়ে আরব মিত্রদের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জটিল হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সব মিলিয়ে এই শান্তিচুক্তিকে অনেকেই কূটনৈতিক সমঝোতার চেয়ে বেশি একটি কৌশলগত পিছু হটা হিসেবে দেখছেন। কংগ্রেসম্যান সেথ মোল্টনের ভাষায়, এটি যতটা না যুদ্ধের সমাপ্তি, তার চেয়েও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সম্মানজনকভাবে সরে আসার একটি পথ।