
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান তীব্র দাবদাহে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে ইতালি ও বলকান অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ তাপমাত্রা জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে এবং বিভিন্ন এলাকায় দাবানলের ঝুঁকিও বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই তাপপ্রবাহে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বনাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রশাসন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দেশটির স্বাধীনতা ঘোষণার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতির মধ্যেই মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় তীব্র গরমের সতর্কতা জারি করেছে জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর।
মার্কিন আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দিনের পাশাপাশি রাতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকায় গরমজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তি, শিশু এবং যাদের পর্যাপ্ত শীতল পরিবেশে থাকার সুযোগ নেই, তারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
পশ্চিম ইউরোপের কিছু এলাকায় জুন মাসের রেকর্ড তাপমাত্রা সামান্য কমলেও আগামী সপ্তাহে ফের গরম বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ইতালিতে সোমবার উত্তরাঞ্চলের বোলজানো থেকে শুরু করে দক্ষিণের সিসিলির পালেরমো পর্যন্ত ২২টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। রাজধানী রোমে ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে সমবেত হওয়া মানুষদের প্রচণ্ড গরম থেকে রক্ষা পেতে ছাতা ও হাতপাখা ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
পশ্চিম বলকান অঞ্চলেও দাবানল পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। ক্রোয়েশিয়ার আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ রাজধানী জাগরেবসহ স্প্লিট ও দুব্রোভনিক অঞ্চলে উচ্চমাত্রার সতর্কতা জারি করেছে।
অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের ভিস দ্বীপে পাইন বনের আগুন নিয়ন্ত্রণে বিমান ব্যবহার করছে দমকল বাহিনী। অন্যদিকে সার্বিয়ায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে দেশটির আবহাওয়া বিভাগ।
আলবেনিয়ার কয়েকটি এলাকায়ও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির ক্লোস গ্রামের কাছে ঝোপঝাড় ও জলপাই বাগানে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছেন দমকলকর্মীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০ জুনের পর থেকে শুরু হওয়া এই দাবদাহ মৌসুমের শুরুতেই বহু তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন, অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপরও পড়ছে।
ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলমান তাপপ্রবাহে দেশটিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অন্তত এক হাজার অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের বড় অংশই প্রবীণ নাগরিক।
ফরাসি গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্যারিস ও আশপাশের অঞ্চলের মরদেহ সংরক্ষণ ও সৎকার কেন্দ্রগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে।
জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের চরম তাপপ্রবাহের ঘটনা এখন অনেক বেশি ঘন ঘন ঘটছে। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুই দশক আগের তুলনায় বর্তমানে অস্বাভাবিক উষ্ণ রাতের ঝুঁকি প্রায় একশ গুণ বেড়ে গেছে।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে আরও কয়েক দিন এই তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের কিছু অংশে তাপমাত্রা আবারও বাড়তে পারে।
এদিকে দাবদাহের মধ্যে সাইপ্রাসে একটি মর্মান্তিক ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, রোববার একটি গরম গাড়ির ভেতর থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত দুই শিশুর বয়স ছিল ৮ ও ১০ বছর।