
ভেনেজুয়েলার বিধ্বংসী ভূমিকম্পে মুহূর্তের মধ্যে ধসে যায় ১১ তলা একটি আবাসিক ভবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে যান এক বাবা ও তার দুই শিশু সন্তান। দীর্ঘ প্রায় ২০ ঘণ্টার প্রাণপণ অভিযানের পর সাবেক দমকলকর্মী ছেলে নিজ হাতে জীবিত উদ্ধার করেন বাবা ও দুই ভাইকে। হৃদয়স্পর্শী এই ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ২৪ জুন সন্ধ্যায় উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরার কারাবালেদা এলাকার রিতাসোল প্যালেস ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে স্ত্রী ও দুই ছোট ছেলেকে নিয়ে অবস্থান করছিলেন ৪৬ বছর বয়সী জোসে গার্সিয়া। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টার কিছু পরপরই পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে পুরো ভবনটি ধসে পড়ে।
ধসের পর জোসে গার্সিয়া ভবনের বেজমেন্টে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। তার সঙ্গে ছিল সাত বছর বয়সী ছেলে দিয়েগো এবং ১২ বছর বয়সী সান্তিয়াগো।
নিজের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে হোসে বলেন, "জীবনে এর চেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আর হতে পারে না। একদিকে চারপাশে কংক্রিটের স্তূপ, অন্যদিকে সন্তানদের নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা।"
খবর পেয়ে উদ্ধারকাজে ছুটে আসেন জোসের ২৬ বছর বয়সী বড় ছেলে জেসুস গার্সিয়া। একসময় তিনি লা গুয়াইরার দমকল বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। চাকরি ছেড়ে দিলেও তার এক সাবেক সহকর্মী ব্যবহৃত হেলমেট ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। সেই সরঞ্জাম পরেই তিনি ধসে পড়া ভবনের সামনে পৌঁছান।
জেসুস জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনি জানতেন না পরিবারের কেউ বেঁচে আছেন কি না। পরে এক দমকল সদস্য তাকে জানান, তার বাবা ও দুই ভাই এখনও জীবিত এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন।
প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। কিছুক্ষণ পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বাবার কণ্ঠ শুনতে পান। তখন হোসে চিৎকার করে বলছিলেন, "আমাকে এখানে রেখে যেও না।"
জবাবে জেসুস বলেন, "শান্ত থাকুন। শিশুদেরও শান্ত রাখুন। আমি আপনাদের না নিয়ে কোথাও যাব না।"
তবে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার অভিযান শুরু করা সম্ভব হয়নি। প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে পুরো রাত অপেক্ষা করতে হয়। পরদিন সকালে বিশেষ উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সাবেক সহকর্মীদের সহায়তায় প্রায় ২০ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় জেসুস ধ্বংসস্তূপ ভেদ করে বাবা ও দুই ভাইকে জীবিত উদ্ধার করেন।
উদ্ধারের মুহূর্তের স্মৃতি তুলে ধরে জেসুস বলেন, "দুই ভাইকে জীবিত দেখে জড়িয়ে ধরেছিলাম। তাদের বলেছিলাম, আমি তোমাদের ভালোবাসি। এরপর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি, কেঁদে ফেলেছিলাম।"
নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে জোসে গার্সিয়া বলেন, "নতুন জীবন পাওয়ার জন্য তিনি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন।" তবে তার স্ত্রী এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ রয়েছেন। ঘটনার ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও তিনি আশা হারাননি।
তিনি বলেন, "যেভাবে বিশ্বাস করেছিলাম আমি আর আমার সন্তানরা জীবিত বের হতে পারব, এখনো তেমনি বিশ্বাস করি, আমার স্ত্রীও জীবিত ফিরবেন।"
বর্তমানে প্রতিদিন ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে উদ্ধারকাজ পর্যবেক্ষণ করেন জোসে। সামনে কীভাবে জীবন আবার নতুন করে শুরু করবেন, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তার কথাও জানান তিনি।
তার ভাষায়, "আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু কীভাবে, কতটা মূল্য দিয়ে সেটা এখনও জানি না।"
সরকারি হিসাবে, এই ভূমিকম্পে অন্তত ৮৫৬টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯০টি ভবন পুরোপুরি ধসে গেছে। তবে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ইয়ান কোস্তা বলেন, হাজার হাজার মানুষ এখনও জানেন না তারা কোথায় আশ্রয় নেবেন কিংবা কীভাবে নতুন করে জীবন গড়ে তুলবেন। এই অনিশ্চয়তা তাদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
তিনি আরও বলেন, "অনেক মানুষের অভিযোগ, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ধীরগতির কারণে ক্ষোভ ও হতাশা আরও বেড়েছে।"