
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আরব দেশগুলোর চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন এনেছে। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশি সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক ও সম্মিলিত ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে বাইরের শক্তি ও তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘাঁটি নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে উঠেছে।
তিনি দাবি করেন, যেসব দেশে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি ছিল না, সেসব দেশ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিল এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলোর তুলনায় যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিও কম হয়েছে। আরাগচির ভাষ্য, স্বাগতিক দেশগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও এসব ঘাঁটি বাস্তবে ইসরাইলকে সুরক্ষা দিয়েছে; স্বাগতিক দেশগুলোকে রক্ষা করতে পারেনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, যুদ্ধের পর পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিয়ে পুরো অঞ্চলে আরও বাস্তবভিত্তিক উপলব্ধি তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা হতে হবে সম্মিলিত এবং এর সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও যুক্ত করতে হবে। একটি দেশ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার দিক থেকে অন্য দেশের তুলনায় ভারসাম্যহীন অবস্থায় থাকলে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরাগচি জানান, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রনীতি যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন’ হবে।
তিনি দাবি করেন, ইরানকে দুর্বল মনে করার ধারণা এখন পুরোপুরি দূর হয়ে গেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে ইরানকে দুর্বল ভাবার ভুল ধারণাই দেশটির ওপর হামলার সুযোগ তৈরি করেছিল। তবে ৪০ দিনের প্রতিরোধের পর ইরানের একটি নতুন ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে—কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজ শক্তিতে টিকে থাকতে সক্ষম একটি শক্তিশালী ও প্রতিরোধী দেশ হিসেবে।
যুদ্ধের সময়ে ইরানের জনকূটনীতিও কার্যকর ও প্রভাবশালী ছিল বলে দাবি করেন আরাগচি। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে ইরানের প্রভাব পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর সম্মিলিত প্রভাবকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিদেশে দায়িত্ব পালনরত ইরানি কূটনীতিকদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় চাপের মধ্যেও কোনো কূটনীতিক দায়িত্ব থেকে সরে যাননি।
সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ভূমিকাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সম্পাদনের ক্ষেত্রে পেজেশকিয়ানের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরাগচির দাবি, ১২ দিনের যুদ্ধের পর পেজেশকিয়ান কেবল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে চাননি; এমনভাবে সংঘাতের অবসান চেয়েছিলেন, যাতে একই ধরনের যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার সুযোগ না থাকে। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের শুরুতে দেওয়া ১৫ দফার খসড়া কার্যত ‘আত্মসমর্পণের দলিল’ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৪ দফার চূড়ান্ত এমওইউতে পৌঁছানোর মাধ্যমে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
পেজেশকিয়ান পদ্ধতিগতভাবে সংস্কারপন্থি হলেও নীতির প্রশ্নে সম্পূর্ণ আদর্শনিষ্ঠ বলে মন্তব্য করেন আরাগচি। পাশাপাশি ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা এবং দেশের সব মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়ে পেজেশকিয়ানের গভীর অঙ্গীকার রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।