
দীর্ঘ দুই যুগের প্রতীক্ষা পেরিয়ে বহুল আলোচিত ২০০১ সালের রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা মামলায় হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করলেও এখনো প্রকাশ হয়নি পূর্ণাঙ্গ রায়, যা চলতি মাসেই প্রকাশ পেতে পারে বলে জানা গেছে। এই রায়কে কেন্দ্র করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিতে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ উভয়েই অপেক্ষায় রয়েছে, ফলে মামলাটি আবারও নতুন পর্যায়ে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
গত বছরের ১৩ মে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ দুই দিনব্যাপী রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা তাজ উদ্দিনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করে। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত শাহাদত উল্লাহ জুয়েলের সাজা বহাল রাখা হয়। এছাড়া নিম্ন আদালতে সাজাপ্রাপ্ত আরও ৯ আসামির দণ্ড কমিয়ে ১০ বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা নির্ধারণ করা হয়। মামলার তিন আসামি ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করায় তাদের ক্ষেত্রে কার্যক্রম অকার্যকর ঘোষণা করা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রায় ঘোষণা হয়েছে, তবে পূর্ণাঙ্গ কপি এখনো প্রকাশ হয়নি। এটি প্রকাশিত হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং আপিল বিভাগে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরা কাজ করব।’ অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির একটি গণমাধ্যমকে জানান, ‘পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ না হওয়ায় এখনো আপিল করা সম্ভব হয়নি। রায় প্রকাশিত হলে আপিল বিভাগে শুনানি হবে এবং তখনই মামলার চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে।’
হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রায়ের লিখনকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং চলতি মাসের মধ্যেই এটি প্রকাশিত হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই মামলার আইনি প্রক্রিয়া আবারও গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মামলার ইতিহাস বলছে, ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সময় রমনা বটমূলে ভয়াবহ বোমা হামলায় ১০ জন নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৯ জন, যাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা গেলেও একজনের পরিচয় অজ্ঞাতই থেকে যায়। এই ঘটনায় রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে পুলিশ।
ঘটনার প্রায় ১৩ বছর পর, ২০১৪ সালের ২৩ জুন বিচারিক আদালত হত্যা মামলায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে দণ্ডপ্রাপ্তরা হাইকোর্টে আপিল করলে দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুনানি শেষ হয় এবং মে মাসে রায় ঘোষণা করা হয়।
এই মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০০৬ সালে, যখন মুফতি হান্নান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে সিআইডি ১৪ জনকে আসামি করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে পৃথক অভিযোগপত্র জমা দেয়। তবে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে দায়ের করা মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে এবং বর্তমানে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যায়ে আছে।
রমনা বটমূলের এই হামলা শুধু একটি সন্ত্রাসী ঘটনা নয়, বরং দেশের সাংস্কৃতিক চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের অপেক্ষা তাই শুধু আইনি প্রক্রিয়ার অংশ নয়, এটি বিচারপ্রাপ্তির দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও বটে।