
রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার এক দশক পূর্তিতে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীল’ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে হামলায় নিহতদের স্মরণ করে শান্তি, সহনশীলতা ও মানবতার মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন সরকার এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা।
বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে গুলশানে ইতালির রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানে এ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। জঙ্গি হামলায় নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, হামলা থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তি এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় মোট ২৪ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি, নয়জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি এবং একজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি, যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত উপরাষ্ট্রদূত আলবার্ট সিয়া, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসেফ রামাদান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সর্বক্ষেত্রে মোকাবিলায় সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ ধরনের শক্তির বাংলাদেশে কোনো স্থান নেই এবং দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে তাদের কখনোই সুযোগ দেওয়া হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুধু নিহতদের স্মৃতির প্রতিই নয়, তাদের পরিবারের সাহস, সহনশীলতা ও ঐক্যের প্রতিও শ্রদ্ধা জানাই। তাদের স্মৃতি যেন ঘৃণা ও সংঘাতের বিরুদ্ধে আমাদের পথ দেখায়। মানবতা, সহমর্মিতা ও সহনশীলতার মূল্যবোধ আমরা যেন সব সময় ধারণ করি।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলায় সরকার সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, নাগরিক সমাজ, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নারী, তরুণ, বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন করছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ২০১৬ সালের ওই হামলার মাধ্যমে জঙ্গিরা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা ও বিভাজন সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। তবে সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বরং মানুষের মধ্যে সংহতি, পারস্পরিক সংলাপ এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশে সন্ত্রাসবাদ যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়।
ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বলেন, ‘২৪ জন নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। ইতালীয়রা বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আর জাপানি নাগরিকরা জাইকার মাধ্যমে ঢাকার মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করছিলেন।’
অনুষ্ঠানে ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেলার পাঠানো বার্তাও পড়ে শোনানো হয়। বার্তায় বলা হয়, সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ঘৃণা ও বিভাজন ছড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু এর পরিবর্তে মানুষের মধ্যে সংহতির বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে সংলাপের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এ সময় নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেনের বড় ভাই যারেফ আয়াত হোসেন, বাংলাদেশ পুলিশ এবং ঢাকায় অবস্থানরত ইতালীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। অনুষ্ঠানে ফারাজ আইয়াজ হোসেনের মা ও ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান, নিহত ইতালি ও জাপানের নাগরিকদের পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।