
জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কওমি ঘরানার প্রভাবশালী আলেম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক এখন তীব্র সমালোচনার মুখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ ও নেটিজেনদের মধ্যে তাঁর এই ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ক্ষমতার রাজনীতির টানে কি তিনি নিজের এবং তাঁর পিতার আজীবন লালিত আদর্শ থেকে সরে আসছেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ইসলামী আন্দোলনের এক সংবাদ সম্মেলনের পর। সেখানে অভিযোগ করা হয়, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে দেশে ইসলামী শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করবে না। এই অভিযোগের জবাবে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিদ্যমান আইনই অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট। তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় বিতর্ক, যা আরও ঘনীভূত হয় মাওলানা মামুনুল হকের প্রকাশ্য সমর্থনে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, "জামায়াত আমিরের কথার মূল অর্থ হলো, যে প্রক্রিয়ায় বর্তমানে দেশ চলছে, নির্বাচন হচ্ছে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে রাজনীতির ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হচ্ছে; এই প্রক্রিয়ায় এক দফার মধ্য দিয়ে হঠাৎ করে একদিনেই শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। একথার মধ্যে কোনো অসংগতি নেই।"
তবে তাঁর এই ব্যাখ্যা সহজভাবে নিতে পারছেন না অনেক অনুসারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ তাঁকে কটাক্ষ করে ‘১০-দলীয় জোটের মুখপাত্র’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। একজন ব্যবহারকারী লেখেন, "জেলখানার দিনগুলোর সেই করুণ চেহারা, লোকটা যখন রিমান্ডে শারীরিক নির্যাতনের কারণে জোয়ান বয়সে লাঠি ভর দিয়ে করুণ দৃষ্টিতে তাকাতো, তখন যতটা না খারাপ লাগতো, এখন সেই ব্যক্তির মুখ থেকে এমন দেউলিয়া পূর্ণ বক্তব্য শুনে তার চেয়ে বেশি কষ্ট লাগছে।"
সমালোচকদের একাংশের মতে, শরিয়া আইন বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ‘এক চুলও ছাড় নয়’ স্লোগান দিয়েছেন, ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতেই তাঁদের মুখে ‘ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া’ কিংবা ‘বাস্তবতা’র যুক্তি মানায় না।
মাওলানা মামুনুল হকের বাবা, প্রখ্যাত আলেম শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রাহ.) আজীবন আপসহীনভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মামুনুল হকের দৃঢ় অবস্থান এবং কারাবরণ তাঁকে ইসলামী রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী পরিচিতি এনে দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামের নামে রাজনীতি করা একটি জোটের কৌশলে জড়িয়ে ক্ষমতার মোহে পড়লে তাঁর বাবার সেই আদর্শিক উত্তরাধিকারই আজ প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
অনেক সমালোচক মনে করেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নির্যাতনের শিকার হয়ে যে বিপুল জনসমর্থন মামুনুল হক পেয়েছিলেন, তার মূল কারণ ছিল তাঁর আপসহীন ভূমিকা। কিন্তু বর্তমানে জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশলের পক্ষে তাঁর ভিন্ন সুর তাঁর ভক্তদের মনে গভীর আঘাত দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আসন্ন নির্বাচনী জোট ও ক্ষমতার ভাগাভাগির সমীকরণে তিনি হয়তো বাস্তববাদী বা নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন। তবে এই কৌশলী অবস্থান তাঁর দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। সামাজিক মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরাও প্রশ্ন তুলছেন, যদি বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতর দিয়েই ধাপে ধাপে এগোতে হয়, তাহলে গত কয়েক দশকের রাজপথের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্য কোথায়।