
নিজের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সরাসরি জবাব দিলেন সাবেক আইন উপদেষ্টা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করা আসিফ নজরুল তার বিরুদ্ধে ওঠা সব ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ নাকচ করে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
বুধবার (০৪ মার্চ) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি দাবি করেন, দায়িত্বে থাকাকালীন বা জীবনের কোনো সময়েই তিনি এক টাকার দুর্নীতিও করেননি।
পোস্টে আসিফ নজরুল উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর তাকে ঘিরে নতুন করে দুর্নীতির গুঞ্জন ছড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কেনা এবং পরিবারসহ সেখানে স্থায়ী হওয়ার অভিযোগকে তিনি ‘ভিত্তিহীন গুজব’ বলে আখ্যা দেন। তার ভাষায়, “আমেরিকা তো দূরের কথা, বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বের কোনো দেশেই আমার কোনো বাড়ি বা সম্পত্তি নেই।”
ফেসবুক পোস্টে যা বললেন আসিফ নজরুল
নিজের পোস্টে “আসিফ নজরুলের দুর্নীতি?” শিরোনামে তিনি লেখেন, প্রায় এক বছর আগে ইউটিউবে একটি গুজব ছড়ানো হয়—তিনি নাকি আমেরিকায় বাড়ি কিনেছেন, পরিবার সেখানে চলে গেছে এবং তিনিও শিগগিরই চলে যাবেন। এ নিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিডিওটি দেখেছেন এবং কেউ কেউ তা বিশ্বাসও করেছেন বলে জানান তিনি।
পরবর্তীতে সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দিন-এর এক অনুষ্ঠানে বিষয়টি ওঠে বলেও উল্লেখ করেন আসিফ নজরুল। সেখানে তিনি বলেন, আমেরিকায় বাড়ি কিনলে তার সরকারি রেকর্ড থাকে এবং তা গোপন রাখা সম্ভব নয়। তিনি সকল ইউটিউবার, সাংবাদিক ও গোয়েন্দাদের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন—তার নামে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বাড়ি থাকলে তার প্রমাণ উপস্থাপন করতে। একইসঙ্গে তিনি অনুরোধ করেন, যদি প্রমাণ হাজির করা না যায়, তাহলে যারা এই গুজব ছড়িয়েছে তাদের কথা যেন কেউ বিশ্বাস না করে।
তিনি দাবি করেন, চ্যালেঞ্জ জানানোর পর প্রায় আট মাস পেরিয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ঠিকানা, দলিল বা সাক্ষ্য-প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “আমেরিকা কেন, বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বের কোনো দেশেই আমার বাড়ি নেই। কোনো রকম সম্পত্তিও নেই।”
নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ
পোস্টে তিনি আরও বলেন, এক সময় গুজব কিছুটা কমে এলেও অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তার ও তার কয়েকজন সহকর্মীর বিরুদ্ধে কথিত দুর্নীতির নতুন নতুন অভিযোগ ছড়াতে শুরু করে। প্রথমে কিছু অনলাইন মাধ্যমে, পরে তা কপি-পেস্ট হয়ে অন্যান্য মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে কিছু সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তার সহকর্মীদের অনেকে এসব অভিযোগকে গুরুত্ব না দিলেও, যেসব মানুষ তাকে ভালোবাসেন ও তার জন্য দোয়া করেন—তাদের কথা বিবেচনা করেই নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরছেন বলে জানান আসিফ নজরুল।
দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও এলাকাপ্রীতি—তিনটি বিষয়ে বক্তব্য
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে তিনি তিনটি পয়েন্ট তুলে ধরেন।
প্রথমত, তিনি বলেন, “আমি সরকারে থাকা অবস্থায় বা এর আগে-পরে জীবনে কখনো কোনো দুর্নীতি করিনি। এক টাকা—আবার বলি, এক টাকাও দুর্নীতি করিনি।” তিনি দাবি করেন, নিজের জ্ঞাতসারে কাউকে দুর্নীতি করতেও দেননি। কোনো নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেননি, নতুন সম্পদ অর্জন করেননি এবং আয়কর দেওয়ার সময় কোনো সম্পদ গোপন রাখেননি।
দ্বিতীয়ত, স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, দায়িত্বে থাকাকালে পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়স্বজনকে কোনো ধরনের সুবিধা দেননি। প্রায় পাঁচ হাজার আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন আত্মীয়কেও নিয়োগ দেননি এবং আত্মীয়রা কারও পক্ষে তদবির করার সুযোগও পাননি।
তৃতীয়ত, এলাকাপ্রীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় নিজের গ্রামের বাড়ি বা ঢাকার যে এলাকায় তিনি বেড়ে উঠেছেন, সেখানে একবারও যাননি। তবে লালবাগ শাহী মসজিদ-এর জরুরি উন্নয়নের জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে নিয়ম মেনে সামান্য আর্থিক সহযোগিতা পেতে সহায়তা করেছেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ডাকসুর আবেদনের ভিত্তিতে ক্রিকেট বোর্ডের কাছে অনুরোধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ উন্নয়নে কিছু অনুদান আনার কথাও উল্লেখ করেন। এর বাইরে কারও জন্য অনুদানের অনুরোধ করেননি বলে জানান তিনি।
অপবাদের জবাবে ধর্মীয় উল্লেখ
পোস্টের শেষাংশে তিনি লেখেন, বহু “জঘন্য ও পৈশাচিক মিথ্যাচার” সহ্য করে যাচ্ছেন। মহানবী (সাঃ) ও বহু আলেমও অপবাদে আক্রান্ত হয়েছেন উল্লেখ করে নিজেকে তাদের তুলনায় নগণ্য মানুষ বলে অভিহিত করেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, অন্যের হক নষ্ট করে বেঁচে থাকার জন্য তার জন্ম হয়নি।
অভিযোগকারীদের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ানোর ইচ্ছা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, “দিনশেষে আমার কোনো ক্ষতি আপনারা করতে পারবেন না… আল্লাহ আছেন, আমার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিয়ামাল ওয়াকিল।”