
চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী বছরের শুরুতে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। ওই কাউন্সিলে দলের বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আর মহাসচিব পদে থাকছেন না—এমন ইঙ্গিত তিনি নিজেই বেশ আগেই গণমাধ্যমকে দিয়েছেন। ফলে নতুন মহাসচিব কে হচ্ছেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এরই মধ্যে আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত বলে দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০১৬ সালে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে তিনি ছয়বার কারাবরণ করেন। প্রায় দেড় দশক মহাসচিবের দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সময় তাকে পরিবর্তনের গুঞ্জন উঠলেও সজ্জন ব্যক্তি ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে তার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল দলের জন্য।
বিএনপির অতীত ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে দলের প্রথম যুগ্ম মহাসচিবকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার পর পরবর্তী সময়ে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হয়েছে। সে হিসেবে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হতে পারে।
যে কারণে আলোচনায় রিজভী
নতুন মহাসচিব হিসেবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নামই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। দলের নেতাকর্মীদের মতে, সারা দেশের জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে রিজভীর ব্যাপক ধারণা রয়েছে।
দীর্ঘদিন দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি সরকারবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় বিভিন্ন সময়ে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদের নামও আলোচনায়
পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামও আলোচনায় রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ভারতে অবস্থান করেও তিনি সরকারবিরোধী আন্দোলনে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও পরিচিত সালাহউদ্দিন আহমদ। বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে সংসদে তার ভূমিকা এবং বিরোধী দলের বিভিন্ন সমালোচনার জবাবে তার কৌশলী বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে।
তবে দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করার কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ তুলনামূলক কম—এ বিষয়টিকে মহাসচিব হওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বাধা হিসেবে দেখছেন দলের অনেক নেতাকর্মী।
আরও যাদের নাম আলোচনায়
এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানির নামও আলোচনায় রয়েছে।
দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা মনে করেন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে প্রায়ই তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দূরত্ব তৈরি হয়। তাই সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে—এমন পরীক্ষিত নেতাকেই মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া উচিত।
বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, যেহেতু দলের চেয়ারম্যান বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী, তাই মহাসচিবই দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক নেই—এমন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তা সংগঠনের জন্য বুমেরাং হতে পারে।
তৃণমূল চায় কর্মীবান্ধব নেতৃত্ব
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা দলের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত, তৃণমূলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং কর্মীবান্ধব কাউকে মহাসচিব হিসেবে দেখতে চান।
তাদের মতে, নতুন মহাসচিবকে সারা দেশের নেতাকর্মীদের সম্পর্কে ধারণা রাখার পাশাপাশি সাংগঠনিক দক্ষতাও থাকতে হবে।
বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, জনগণ ভোটের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে বিএনপি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। তাই দলের মহাসচিব একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হবেন—এটাই প্রত্যাশা। দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থাকা নেতাদের মধ্য থেকেই মহাসচিব নির্বাচন করা উচিত।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ বলেন, বিগত ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে যারা নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন, তাদের মধ্য থেকেই মহাসচিব নির্বাচনের প্রত্যাশা রয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, দল ও দেশের জন্য যা ভালো হবে, সেটিই করা হবে। তবে মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে ত্যাগী, বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞ কাউকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পছন্দের এবং তার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে সক্ষম এমন কাউকেই মহাসচিব করা হবে। তুলনামূলক তরুণ কেউ এ পদে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে। কর্মীবান্ধব নেতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন দলে সংগঠন ও সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপির বর্তমান প্রেক্ষাপটে মহাসচিব পদটি শুধু একটি পদ নয়; বরং সারা দেশের তৃণমূল সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ধরে রাখার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
রুহুল কবির রিজভীর বড় সুবিধা হলো, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সামলানোর কারণে সারা দেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। বিরোধী রাজনীতি থেকে ক্ষমতাসীন দলে রূপান্তরের এই সময়ে বিএনপিকে নতুন সাংগঠনিক গতি দিতে এ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।