
মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরুর পর দেশটির অভিবাসন আটককেন্দ্রগুলোতে অন্তত ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস। সংস্থাটির অভিযোগ, অতিরিক্ত ভিড়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় এসব মৃত্যু ঘটেছে। একই সঙ্গে ঘটনাগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে তারা।
রোববার (১৯ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ দাবি তুলে ধরে ফোর্টিফাই রাইটস।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির অভিবাসন আটককেন্দ্রে মোট ৪৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৩ জন পুরুষ, ৬০ জন নারী এবং ১২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
ফোর্টিফাই রাইটস জানায়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মিলিয়ে আটক অবস্থায় ১০৯ জনের মৃত্যু হয়। পরে গত ১৪ জুলাই পার্লামেন্টে উপস্থাপিত তথ্যে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আরও ৩১ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়। ফলে ২০২৪ সালে অভিযান জোরদারের পর থেকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪০ জনে।
সংস্থাটির ভাষ্য, অবৈধ অভিবাসী ও শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান বাড়ানোর ফলে আটক ব্যক্তির সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশটির আটককেন্দ্রগুলোতে ২২ হাজার ৪৫ জন রয়েছেন, যা সরকারি ধারণক্ষমতা ২১ হাজার ৫৩০ জনেরও বেশি।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেপসিস, লেপ্টোস্পাইরোসিস ও মেনিনজাইটিসসহ বিভিন্ন রোগে এসব মৃত্যু হয়েছে। তবে ফোর্টিফাই রাইটসের দাবি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন, অতিরিক্ত ভিড় এবং সময়মতো চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় এসব রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া কয়েক ডজন সাবেক আটক ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সংস্থাটি আরও অভিযোগ করেছে, অসুস্থ হলেও অনেককে চিকিৎসা দেওয়া হতো না। চিকিৎসা চাইলে কেউ কেউ শাস্তির মুখেও পড়তেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু প্যারাসিটামল দিয়ে চিকিৎসার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হতো বলেও দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশি এক সাবেক আটক ব্যক্তি, যাকে ‘হোসেন’ ছদ্মনামে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযোগ করেন, অসুস্থতার কথা জানালে অনেককে মারধরের শিকার হতে হতো। এ কারণে অনেকেই ভয় পেয়ে নিজের শারীরিক সমস্যার কথা গোপন রাখতেন। গুরুতর অসুস্থ না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়া হতো না বলেও তিনি দাবি করেন।
রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের কয়েকজন সাবেক আটক ব্যক্তিও একই ধরনের অভিযোগ তুলে বলেন, জ্বর, পেটব্যথা বা দাঁতের তীব্র ব্যথার মতো সমস্যায়ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়ে শুধু প্যারাসিটামল দেওয়া হতো।
ফোর্টিফাই রাইটস বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী আটক প্রত্যেক ব্যক্তির পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের ‘নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস’ অনুযায়ী বন্দিদের সাধারণ নাগরিকদের সমমানের এবং বিনামূল্যের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ পরিচালক পিটার বাউকার্ট বলেন, ‘অভিবাসন আটককেন্দ্রগুলোর অমানবিক পরিস্থিতি অপ্রয়োজনীয় মৃত্যুর জন্য দায়ী। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অতীতের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।’
তথ্যসূত্র: ফোর্টিফাই রাইটস।
রেডফ্ল্যাগ শব্দ: নেই