
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ঘরোয়া আসরের এক সময়ের নির্ভরযোগ্য বাঁহাতি স্পিনার মোশাররফ হোসেন রুবেল আজ স্মৃতির পাতায়। আজ ১৯ এপ্রিল, ২০২২ সালের এই দিনে মস্তিষ্কের টিউমারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। তবে রুবেলের গল্প শুধু একজন ক্রিকেটারের সাফল্য-ব্যর্থতার নয়, বরং এক দীর্ঘ মানবিক লড়াই, ভাঙা-গড়া আর অসীম ভালোবাসারও গল্প।
১৯৮১ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া রুবেল ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এক নিবেদিতপ্রাণ স্পিনার হিসেবে। ঢাকা বিভাগের হয়ে ২০০১-০২ মৌসুমে যাত্রা শুরু করে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দলের ভরসার নাম।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার পরিসংখ্যানই বলে দেয় তার ধারাবাহিকতা ও দক্ষতার কথা। ১১২ ম্যাচে ৩ হাজারের বেশি রান ও প্রায় চারশ উইকেট তাকে ঘরোয়া ক্রিকেটে আলাদা অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও ব্যাট-বল দুই দিকেই ছিল তার কার্যকর উপস্থিতি।
২০০৮ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার। যদিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার পথচলা ছিল সংক্ষিপ্ত, মাত্র পাঁচটি ওয়ানডে ম্যাচে সীমাবদ্ধ, তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে তিনি ছিলেন দীর্ঘ সময়ের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
যদিও তার এই সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারকে শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের আলোকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে কিংবদন্তি স্পিনার মোহাম্মদ রফিক অবসরগ্রহণের সময় বলেছিলেন, তার উত্তরসূরি হতে পারেন মোশাররফ রুবেল।
রুবেলের ক্যারিয়ারের এক আলোচিত অধ্যায় জড়িয়ে আছে ভারতের বিদ্রোহী ক্রিকেট লিগ আইসিএলের সঙ্গে। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া এই লিগে তিনি যোগ দেন, আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাঠামোর বাইরে যাওয়ার কারণে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন, যা তার জাতীয় দলে ফেরার পথকে কঠিন করে তোলে।
ক্যারিয়ারের মাঝপথে এই সিদ্ধান্ত তাকে অনেকটাই ছিটকে দেয় মূল স্রোত থেকে। তবে ২০০৯ সালে আইসিএল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আবার ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে আসেন তিনি, এবং নিজের পরিচিত লড়াকু মানসিকতা দিয়েই নতুন করে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান।
তবে রুবেলের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয় ২০১৯ সালে, যখন তার মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ে। চিকিৎসার এই দীর্ঘ পথচলায় তার পরিবারকে পাড়ি দিতে হয় এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। চিকিৎসার বিপুল ব্যয় মেটাতে গিয়ে ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে পড়ে রুবেলের পরিবার, বিক্রি করতে হয় ব্যক্তিগত সম্পদও।
এই কঠিন সময়ে সীমিত পরিসরে কিছু সহায়তা আসে ক্রিকেট অঙ্গন থেকে, সহকর্মী ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকেও পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হয়, তবে রোগটির ভয়াবহতা ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার সামনে তা ছিল খুবই সামান্য।
এই পুরো লড়াইয়ের কেন্দ্রে ছিলেন তার সহধর্মিণী চৈতী। রুবেলের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তিনি। একদিকে সংসার, একদিকে সন্তান, আরেকদিকে অসুস্থ স্বামীর সার্বক্ষণিক পরিচর্যা, সবকিছু একাই সামলাতে হয়েছে তাকে।
এমনকি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার পর রুবেলের দৈনন্দিন কাজ, খাওয়া-দাওয়া ও চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট অনেক কিছুই তাকে নিজ হাতে দেখভাল করতে হয়েছে। ধীরে ধীরে যখন রুবেল স্বাভাবিকভাবে খেতে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখনও চৈতী নিঃশব্দ যত্নে তার পাশে ছিলেন প্রতিটি মুহূর্তে।
এই দীর্ঘ অসুস্থতার সময়টায় রুবেলের পরিবার কার্যত এক কঠিন মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে ভালোবাসা ছিল, কিন্তু ছিল সীমাহীন লড়াইও। চৈতীর এই অবদান ঘরোয়া ক্রিকেট ইতিহাসের বাইরে গিয়ে এক নিঃশব্দ কিন্তু গভীর মানবিক অধ্যায় হয়ে আছে।
রুবেলের মৃত্যুর চার বছর পরও তার সহধর্মিণীর সেই লড়াই অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে। তবে জীবন চলমান, আর সেই বাস্তবতার মধ্যেই চৈতীও নিজের জীবনে নতুনভাবে এগিয়ে গেছেন। তবুও রুবেলের শেষ সময়ের এই গল্প তাকে শুধু একজন ক্রিকেটার হিসেবে নয়, বরং একটি পরিবারের ভালোবাসা, ত্যাগ আর টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।
আজ রুবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করা হয় একজন স্পিনার হিসেবে নয় শুধু, বরং এমন একজন মানুষ হিসেবে, যার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে জড়িয়ে ছিল অদম্য লড়াই, আর পাশে ছিল নিঃশব্দ কিন্তু শক্তিশালী এক ভালোবাসার হাত।