
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী একটি ছবি। দুই দশক আগে বার্সেলোনায় তোলা সেই ছবিতে তরুণ লিওনেল মেসির কোলে ছিলেন মাত্র পাঁচ মাস বয়সী লামিনে ইয়ামাল। সময়ের ব্যবধানে ছবিটি এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে, কারণ সেই শিশুই আজ স্পেনের সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে মাঠে নামতে যাচ্ছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসির বিপক্ষে। আর ছবিটির পেছনের গল্প তুলে ধরেছেন স্প্যানিশ ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ট।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মনফোর্ট বলেন, ছবিটি ধারণ করা মোটেও সহজ ছিল না। তার ভাষায়, ‘ছবিটি তোলা সত্যিই খুব কঠিন ছিল। এটুকু বলতে পারি, এটি ক্যামেরাবন্দি করতে আমাকে রীতিমতো রক্ত পানি করতে হয়েছিল।’

ঘটনাটি ২০০৭ সালের ডিসেম্বরের। তখন বার্সেলোনার মূল দলে মাত্র তিন বছর কাটিয়েছেন ২০ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন ও স্প্যানিশ দৈনিক দিয়ারিও স্পোর্টের যৌথ উদ্যোগে ইউনিসেফসহ কয়েকটি দাতব্য তহবিলের জন্য ২০০৮ সালের একটি চ্যারিটি ক্যালেন্ডারের ফটোশুট আয়োজন করা হয়। সেই আয়োজনেই পাঁচ মাস বয়সী লামিনে ইয়ামালের সঙ্গে মেসির সাক্ষাৎ ঘটে।
ছবিগুলো দীর্ঘদিন খুব একটা আলোচনায় না থাকলেও ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালে ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেগুলো প্রকাশ করলে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। একটি ছবিতে দেখা যায়, প্লাস্টিকের বাথটাবে থাকা শিশুটিকে গোসল করাতে সাহায্য করছেন মেসি। অন্য ছবিতে তোয়ালে জড়িয়ে স্নেহভরে কোলে তুলে নিয়েছেন ভবিষ্যতের স্প্যানিশ তারকাকে।
ভাইরাল হওয়ার পর সেই মুহূর্তের স্মৃতি তুলে ধরে মনফোর্ট বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছবিটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনিও বিস্মিত হয়েছিলেন। তার ভাষায়, তখন মেসি ছিলেন কেবল নিজের অবস্থান শক্ত করার পথে এগিয়ে যাওয়া এক তরুণ ফুটবলার। আর কেউ কল্পনাও করেনি, সেই শিশুটি একদিন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হবে।
ফটোশুটের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে মনফোর্ট জানান, খেলোয়াড়দের সময় খুব সীমিত থাকত। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করে ছবি তুলতে হতো। অপরিচিত এক তরুণ ফুটবলার ও একটি শিশুকে নিয়ে কাজ করাটা ছিল বেশ কঠিন। তবে ইয়ামালের মা শিলা এবানার সহযোগিতায় কাজটি সহজ হয়ে যায়। তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য ছিল ভালোবাসা ও আন্তরিকতার একটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করা।
বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের মাতারো শহর থেকে ইয়ামালকে নিয়ে ক্যাম্প ন্যুতে এসেছিলেন তার মা। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি পরিবারকে স্মারক হিসেবে ছবির একটি কপি দেওয়া হয়েছিল। কয়েক বছর পর ২০১৪ সালে মাত্র সাড়ে ছয় বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দেন ইয়ামাল। এরপর ২০২৩ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে লা লিগায় অভিষেক হয় তার। ১৬ বছর বয়সে জাতীয় দলে ডাক পান। ইউরো ২০২৪ জয়ের পর চলতি বিশ্বকাপেও স্পেনের অন্যতম বড় ভরসায় পরিণত হয়েছেন তিনি। বর্তমানে বার্সেলোনায় মেসির কিংবদন্তি ১০ নম্বর জার্সিও পরছেন ইয়ামাল।
জোয়ান মনফোর্ট এই ঘটনাকে ‘লাখে একটি’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ফুটবল ইতিহাসে এমন কাকতালীয় ঘটনা খুব কমই দেখা যায়। তিনি জানান, এটি তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি। বিশ্বকাপ ঘিরে ছবিটি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে এবং ইয়ামালের ক্যারিয়ার যত এগোবে, ততই এই ছবির ঐতিহাসিক মূল্য বাড়বে।
আগামী রোববার (১৯ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। সেই ম্যাচেই প্রথমবার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে দেখা যাবে একসময় কোলে তুলে নেওয়া মেসি এবং সেই কোলের শিশু লামিনে ইয়ামালকে।
তথ্যসূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক