
নিশুতি রাতের অন্ধকারে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ স্থানীয় নেতার বসতবাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। একটি ভারী এস্কেভেটর (ভেকু) দিয়ে পুরো বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক দুইটার দিকে উপজেলার মাধবখালী ইউনিয়নের কাঠালতলী বাজারসংলগ্ন এলাকায় এই হামলার ঘটনাটি ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাড়িটি মাধবখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন শাখার সভাপতি মো. মিজানুর রহমান লাভলু কাজীর। তবে হামলার সময় বাড়িটি তালাবদ্ধ ছিল এবং সৌভাগ্যবশত ভেতরে কোনো মানুষ অবস্থান করছিলেন না।
ক্ষতিগ্রস্ত আওয়ামী লীগ নেতা লাভলু কাজী সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরীর অনুসারী ও কর্মীরা তার বাড়িতে এই তাণ্ডব চালিয়েছে। তার দাবি, হামলাকারীরা প্রথমে একটি বড় এস্কেভেটর নিয়ে এসে পুরো ভবনটি ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। এরপর ঘরের ভেতরের মূল্যবান আসবাব ও মালামাল লুট করে অবশিষ্ট অংশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। লাভলু কাজী আরও অভিযোগ করেন, আলতাফ হোসেন চৌধুরীর ছোট ভাই তথা মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহীন চৌধুরীর সরাসরি নেতৃত্বেই এই বর্বরোচিত হামলাটি পরিচালিত হয়েছে।
ঘটনার রাতেই লাভলু কাজীর আপন ভাই মশিউর রহমান বাবলু কাজী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে বাড়ি ভাঙচুর, মালামাল লুট ও আগুন দেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং এর সপক্ষে বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও চিত্র প্রকাশ করেন। লাইভে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রুখতে প্রশাসনের কাছে তাৎক্ষণিক সহায়তা চাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত হামলা ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
অবশ্য জমিটি নিয়ে ভিন্ন একটি তথ্যও উঠে এসেছে স্থানীয় সূত্রে। জানা গেছে, যে জমির ওপর বাড়িটি অবস্থিত, সেটির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিরোধ চলছে। এলাকার একাংশের দাবি, ২০০৩ সালে এই ভূমিটি মূলত একটি পাবলিক লাইব্রেরির নামে নিবন্ধিত করা হয়েছিল। আবার অন্য পক্ষের দাবি, উক্ত জমির একটি নির্দিষ্ট অংশের বৈধ মালিক লাভলু কাজী নিজেই। এদিকে অনেকের মতে, বিরোধপূর্ণ এই জায়গার সিংহভাগই মূলত সরকারি গণগ্রন্থাগারের সম্পত্তি। এই জমিটি অবৈধ দখলমুক্ত ও উদ্ধারের জন্য পটুয়াখালী সরকারি গণগ্রন্থাগারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে আগেই একটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।
এদিকে, মূল অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আলতাফ হোসেন চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, কারণ তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, প্রধান অভিযুক্ত শাহীন চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।
উক্ত ঘটনা প্রসঙ্গে মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির (স্থগিত কমিটি) সভাপতি শাহাবুদ্দিন নান্নু মুন্সী দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, "এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা নেই। কেউ ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধ করে থাকলে তার দায় দল নেবে না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।"
সরেজমিনে পরিদর্শনে যাওয়া মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মো. রাসেল বলেন, খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান এবং ভাঙচুরের আলামত দেখতে পান। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললেও কেউ ঘটনার বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি। তিনি বলেন, "জমির মালিকানা-সংক্রান্ত একটি আবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রয়েছে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি তদন্ত করছিলেন। তদন্ত চলাকালেই এ ঘটনা ঘটে।"
আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তৌহিদুজ্জামান বলেন, "রাতের অন্ধকারে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"