
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে বাজছে যুদ্ধের দামামা, ইরানের ওপর হামলার মাত্রা আরও বহুগুণ বাড়াতে নজিরবিহীন যুদ্ধপ্রস্তুতি শুরু করেছে ওয়াশিংটন। তেহরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানকে আরও বিস্তৃত করতে এবার ইসরায়েলে আরও কয়েক ডজন আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী (রিফুয়েলিং) বিমান পাঠানোর জোরালো পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই স্পর্শকাতর সামরিক পরিকল্পনার তথ্য নিশ্চিত করেছেন, যা এই অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করা হয়।
সূত্রমতে, হোয়াইট হাউসের টেবিলে বেশ কয়েকটি নতুন সামরিক ব্লুপ্রিন্ট উপস্থাপনের পর ইরানের ভেতরে আরও বড় আকারের হামলার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও এর সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে যে মাত্রায় অভিযান চলছে, তার চেয়ে অনেক বড় পরিসরে হামলা চালানোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য হামলার তালিকায় ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে মূল লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইনের মাটির নিচে অবস্থিত একটি গোপন স্থাপনাও মার্কিন নিশানায় রয়েছে। ওয়াশিংটনের গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ওই ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে নতুন করে সামরিক কাঠামো গড়ে তুলছে তেহরান।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও এই হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সবুজ সংকেত দেননি। অবশ্য কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হামলার তীব্রতা বাড়ানোর পক্ষেই অবস্থান ট্রাম্পের। যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের অনুকূলে রাখা এবং ওয়াশিংটনের দেওয়া শর্ত মেনে নিয়ে ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে পিছু হটতে বাধ্য করা।
ভেতরের সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই হামলার পরিধি বাড়াতে চূড়ান্ত নির্দেশ আসতে পারে। ইতোমধ্যে টানা পাঁচ দিন ধরে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালি ও ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বন্দর আব্বাসের আশপাশের অন্তত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে হামলা চালানো হয়েছে। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলটিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে গণ্য করা হয়।
আমেরিকার এই আগ্রাসনের জবাবে ইরানও তাদের পাল্টা আঘাতের তীব্রতা বাড়িয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা জর্ডান, কাতার, বাহরাইন, ইরাক ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সফল হামলা চালিয়েছে। এছাড়া সিরিয়ার একটি মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।
বর্তমানে ইসরায়েলের তেল আবিবে অবস্থিত বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৩০টি মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান অবস্থান করছে। একই সাথে দেশটির দক্ষিণ অঞ্চলের রেমন বিমানঘাঁটিতেও সমপরিমাণ মার্কিন বিমান মজুত রাখা হয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, খুব শিগগিরই সেখানে আরও কয়েক ডজন মার্কিন বিমান এসে পৌঁছাবে।
পেন্টাগন বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচনা করছে, কারণ ওই অঞ্চলের অন্যান্য মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন হামলার সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে তেল আবিবের প্রধান বেসামরিক বিমানবন্দরে এত বিপুলসংখ্যক মার্কিন সামরিক বিমানের উপস্থিতি নিয়ে খোদ ইসরায়েলের ভেতরেই তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিমানবন্দরের নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বহু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় ইসরায়েলের পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভ বেন গুরিয়ন থেকে মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান সরিয়ে নেওয়ার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) কৌশলগত কারণে এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, অতিরিক্ত হিসেবে পাঠানো এই বিমানগুলো কোথায় সুরক্ষিতভাবে রাখা হবে, সেই বিকল্প ব্যবস্থার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েল সরকারকেই নিতে হবে।