
ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। চূড়ান্ত ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী লিকুদ পার্টি এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতৃত্বাধীন কোনো জোটই নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমান নির্বাচনী ফলাফলে সেই সমীকরণ মেলাতে না পারায় সরকার গঠনের আলোচনা কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত গড়াতে পারে।
দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও আদর্শিক দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় নতুন জোট গঠনের পথও সহজ নয়। বিশ্লেষকেরা অবশ্য সরকার গঠনের কয়েকটি সম্ভাব্য সমীকরণ দেখছেন। তবে কোনোভাবে স্বল্পস্থায়ী জোট সরকার গঠিত হলেও সেটি এক বছরের বেশি টিকে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আগামী ১২ সপ্তাহের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ইসরাইলকে আবারও নির্বাচনে যেতে হতে পারে।
বিরোধী জোটের সরকার গঠনে আরব দলই বড় বাধা
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী দলগুলোর সামনে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বিকল্প হলো ইহুদি ও আরব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা। কিন্তু এই সমীকরণ বাস্তবায়ন করাই বিরোধীদের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিরোধী জোটের দুই ডানপন্থী নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান পার্লামেন্টের আরব দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমের সমর্থনে সরকার গঠনের বিপক্ষে। শুধু সরকারে সরাসরি অংশগ্রহণ নয়, বাইরে থেকে সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর থেকে এ বিষয়ে তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
ইসরাইলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র একবার কোনো আরব দল পূর্ণাঙ্গভাবে সরকারে অংশ নিয়েছে। ২০২১ সালে রা’আমসহ আটটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সেই সরকার এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই ভেঙে যায়।
তবে বিরোধীরা সরকার গঠনে ব্যর্থ হলেও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে নেসেটের স্পিকারসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের বসিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা নেতানিয়াহুর ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা করতে পারে তারা। যদিও নেতানিয়াহুকে সরিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের মতো কার্যকর জোট গঠন এখনো জটিল এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়।
জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা
সরকার গঠনের আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো বর্তমান দুই প্রধান রাজনৈতিক জোটের ভেতরে ভাঙন তৈরি করে জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এ ধরনের সরকার গঠনের জন্য নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির পাশাপাশি তার বর্তমান জোটের কয়েকটি দল এবং বিরোধী শিবিরের অন্তত একটি দলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে।
এ ক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে, নেতানিয়াহু জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ও কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভিরের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে রাজি হতে পারেন। তবে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এবং উগ্র অর্থোডক্স দলগুলোকে জোটের বাইরে রাখার বিষয়ে তিনি সম্মত হবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে, গাদি আইজেনকোট আগেই স্পষ্ট করেছেন, তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে অংশ নেবেন না। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পক্ষে থাকা ইসরাইলের বহু ভোটারের কাছে এই অবস্থান থেকে সরে এসে তার সঙ্গে সরকার গঠন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ বা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের উদ্যোগও বড় বাধার মুখে পড়তে পারে।
বিরোধী শিবিরে ভাঙন ধরিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা
নেতানিয়াহুর সামনে আরেকটি বিকল্প হলো বিরোধী জোটের কোনো দল কিংবা ব্যক্তিগত আইনপ্রণেতাদের নিজের পক্ষে নিয়ে আসা। বিরোধী শিবিরে ভাঙন ধরাতে পারলে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ তৈরি হতে পারে তার জন্য।
কিন্তু এ ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বাধা কম নয়। বিরোধী জোটের চার নেতা গাদি আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট, আভিগদর লিবারম্যান ও ইয়ার গোলান ইতিমধ্যে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এ ছাড়া নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আটটি আসন পিছিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ সরকার গঠনের জন্য অন্তত আটজন আইনপ্রণেতাকে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে তার পক্ষে আসতে হবে। বিরোধী নেতাদের অনড় অবস্থানের মধ্যে এতসংখ্যক আইনপ্রণেতাকে দলত্যাগে রাজি করানো কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছে।
সমঝোতা ব্যর্থ হলে আবারও নির্বাচন
সরকার গঠনের সম্ভাব্য সমীকরণগুলো নিয়ে আলোচনা চললেও পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। তাদের মতামত শোনার পর তিনি একজন রাজনৈতিক নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন।
ধারণা করা হচ্ছে, আরব দলগুলো গাদি আইজেনকোটকে সমর্থন দিতে পারে। এমনটি হলে ইয়াশার পার্টির এই নেতা প্রথমেই সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর সরকার গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট নেতা ২৮ দিন সময় পাবেন। বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সময়সীমা আরও ১৪ দিন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রথম ব্যক্তি সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় একজন নেতাকে একই দায়িত্ব দেবেন। দ্বিতীয় ব্যক্তিও সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন।
দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও সফল না হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা প্রেসিডেন্টের কাছে তৃতীয় একজন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ওই প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য ১৪ দিন সময় পাবেন।
তিন দফা প্রচেষ্টার কোনোটিতেই সরকার গঠনের মতো সমঝোতা না হলে দেশটিতে নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
অচলাবস্থার মধ্যেও সুবিধাজনক অবস্থানে নেতানিয়াহু
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের আলোচনায় সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন নেতানিয়াহু। কারণ, অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সুযোগ রয়েছে তার।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়ে ব্যর্থ হলে পরবর্তী দায়িত্ব নেতানিয়াহুর কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনিও সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি হবে। তবে সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন নেতানিয়াহু।
সব মিলিয়ে আগামী বসন্তের আগে ইসরাইলে নতুন নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এবারের নির্বাচনী ফলাফল দেশটিকে আবারও দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে ফেলতে পারে। পরিস্থিতি সে দিকে গড়ালে মাত্র আট বছরের ব্যবধানে ইসরাইলে সপ্তমবারের মতো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
সূত্র: সিএনএন