
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার তদন্তে কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং, আন্তর্জাতিক অপরাধ, দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে ‘সেরা করদাতা সম্মাননা’র জন্য বিবেচনা করা হবে না। একইভাবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণগ্রহীতারাও এ সম্মাননার তালিকার বাইরে থাকবেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সরকার ‘সেরা করদাতা সম্মাননা প্রদান নীতিমালা, ২০২৬’ প্রকাশ করেছে। নতুন এ নীতিমালায় সেরা করদাতা নির্বাচন ও সম্মাননা প্রদানের বিভিন্ন শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যক্তি, পেশাজীবী, কোম্পানি ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে সর্বোচ্চ কর প্রদানকারীদের সম্মাননা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
এর আগে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের আগে ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর ১৪১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ট্যাক্স কার্ড বা কর কার্ড দেওয়া হয়। ২০২২-২৩ করবর্ষে জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতা হিসেবে ৭৬ ব্যক্তি, ৫৪ প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য ১১টি শ্রেণিতে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে ৫৪ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সম্মাননা ও সম্মাননাপত্র দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)।
চলতি বছরের জুনে সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, কর প্রদানে উৎসাহ সৃষ্টি ও করদাতাদের সামাজিকভাবে সম্মানিত করতে ‘সেরা করদাতা পুরস্কার নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন নীতিমালার আওতায় খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ কর প্রদানকারীসহ মোট ৬৭ জন করদাতাকে ‘সেরা করদাতা’ হিসেবে পুরস্কৃত করার কথা জানানো হয়েছিল।
তবে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যক্তি, কোম্পানি ও বিভিন্ন খাত মিলিয়ে মোট ৭২ জন করদাতাকে সেরা করদাতা সম্মাননা দেওয়া হবে। এর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ে ৩৩ জন, কোম্পানি পর্যায়ে ১৫ জন এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে ২৪টি কোম্পানি থাকবে।
সরকারের লক্ষ্য হলো সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী করদাতাদের স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা এবং অন্য নাগরিকদের নিয়মিত কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করা। প্রতি অর্থবছরে অব্যবহিত পূর্ববর্তী করবর্ষে পরিশোধিত আয়করের পরিমাণের ভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারী ব্যক্তি ও কোম্পানিকে সম্মাননার জন্য নির্বাচন করা হবে।
নীতিমালায় জানানো হয়েছে, ব্যক্তি শ্রেণিতে বিশেষ ক্যাটাগরির ২৪ জনকে সম্মাননা দেওয়া হবে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী ১৫ জন ব্যক্তি করদাতা, সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে একজন নারী ও একজন পুরুষ, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং পাঁচজন নারী করদাতা থাকবেন।
পেশাজীবী শ্রেণিতে সম্মাননা পাবেন আরও নয়জন। এ তালিকায় বেতনভোগী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, স্থপতি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট, খেলোয়াড় এবং শিল্পী—প্রতিটি শ্রেণিতে একজন করে থাকবেন।
কোম্পানি পর্যায়ে সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী ১৫টি কোম্পানিকে সম্মাননা দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাত থেকে আরও ২৪টি কোম্পানিকে নির্বাচন করা হবে। এসব খাতের মধ্যে ব্যাংকিং, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জীবনবিমা, সাধারণ বিমা, চিকিৎসাসেবা, তৈরি পোশাক, প্রকৌশল, ইস্পাত, কৃষি ও খাদ্য, জ্বালানি, পাট, স্পিনিং ও টেক্সটাইল, ওষুধ ও রসায়ন, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, রিয়েল এস্টেট, চামড়া, শিক্ষা, পর্যটন, চা ও সিরামিকসহ বিভিন্ন খাত রয়েছে।
নীতিমালায় সেরা করদাতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে একাধিক যোগ্যতার শর্তও রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট করবর্ষের করসংক্রান্ত কার্যক্রম কমপক্ষে দুই বছর ধরে নিয়মিত থাকতে হবে। একই করদাতাকে একাধিক ক্যাটাগরিতে সেরা করদাতা হিসেবে নির্বাচন করা যাবে না।
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী কর পরিশোধে ব্যর্থতা, অতিরিক্ত বকেয়া কর থাকা অথবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন ও প্রয়োজনীয় বিবরণী দাখিল না করলেও সংশ্লিষ্ট করদাতা সম্মাননার জন্য অযোগ্য হবেন।
আন্তর্জাতিক লেনদেনকারী কোম্পানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফরমে ‘আন্তর্জাতিক লেনদেন সম্পর্কিত বিবরণী’ দাখিল না করলেও সম্মাননা পাওয়া যাবে না। করদাতার বিরুদ্ধে আয়কর বা দানকর ফাঁকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে কিংবা পুনর্নিরীক্ষিত মামলা চলমান থাকলেও তাকে বিবেচনা করা হবে না।
এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তদন্তে কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং, দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলে তাকে সম্মাননার জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। একইভাবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণগ্রহীতাদেরও তালিকায় রাখা হবে না।
সেরা করদাতা নির্বাচনে প্রাথমিক বাছাই, যাচাই ও চূড়ান্ত নির্বাচন—এই তিন ধাপে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। প্রাথমিক বাছাই কমিটি কর অঞ্চল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করবে। এরপর যাচাই কমিটি বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তথ্য সংগ্রহ করে করদাতাদের যোগ্যতা যাচাই করবে। সবশেষে চূড়ান্ত নির্বাচন কমিটি সেরা করদাতার তালিকা অনুমোদন করবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করদাতাদের নাম গেজেটে প্রকাশ করা হবে। তাদের করদাতা সম্মাননা কার্ড ও ক্রেস্ট দেওয়া হবে। গেজেটে নাম প্রকাশের পর দুই বছর পর্যন্ত সম্মাননা কার্ডের মেয়াদ ও নির্ধারিত সুবিধা বহাল থাকবে। অনিবার্য কারণে কোনো করদাতার সম্মাননা প্রত্যাহারও করতে পারবে সরকার।