
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত ও পরবর্তী সমঝোতার প্রেক্ষাপটে নিজের ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার ক্ষমতার কার্যত কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। এমনকি একটি নতুন বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প নিজেকে ইতিহাসের বহু প্রভাবশালী শাসকের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর বলে মনে করেন।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) একটি গণমাধ্যমের অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, নিজের ক্ষমতার সীমা তিনি খুঁজে পাননি। সাক্ষাৎকারজুড়ে তিনি বারবার ইঙ্গিত দেন যে অন্যদের আনুগত্য ও আত্মসমর্পণই তার ক্ষমতার প্রকৃত পরিমাপ।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, জি-৭ সম্মেলনে তিনি যখন ‘আমিই বস’ বলে মন্তব্য করেছিলেন, তখন অন্য নেতারা সেটি বিশ্বাস করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল তাকে ‘প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করে’ এবং ‘আমি যা বলব, তারা তা-ই করবে’।
আগামী মঙ্গলবার প্রকাশিত হতে যাওয়া ‘রেজিম চেঞ্জ’ বইয়ে সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জোনাথন সোয়ান লিখেছেন, ট্রাম্প একাধিকবার এমন একটি নথি দেখিয়েছেন যেখানে তাকে আতিল্লা দ্য হুন, চেঙ্গিস খান, নেপোলিয়ন, স্টালিন, মাও সেতুং ও অ্যাডলফ হিটলারের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বইটির লেখকদের দাবি, ট্রাম্প নিজেই ওই নথি থেকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নাম পড়ে শোনান এবং ব্যাখ্যা করেন কেন আধুনিক মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা তাদের চেয়ে বেশি। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, জুলিয়াস সিজার কিংবা উইলিয়াম দ্য কনকারারের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘ওদের তো কোনও উড়োজাহাজ ছিল না, তাই না? চাইলেই তো সব জায়গায় ভ্রমণ করা যেত না।’
লেখকদের মতে, সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল মাও সেতুং, হিটলার ও স্টালিনের মতো স্বৈরশাসকদের সঙ্গে নিজের নাম এক তালিকায় দেখে ট্রাম্পের স্বতঃস্ফূর্ত সন্তুষ্টি। তারা লিখেছেন, ভয় ও বিজয়ের মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দেওয়া শাসকদের কাতারে নিজেকে দেখতে ট্রাম্পকে অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায়নি।
ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তার পছন্দের বিশ্বনেতাদের কথাও তুলে ধরেন। তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের একাগ্রতার প্রশংসা করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘অত্যন্ত শক্ত মনের মানুষ’ বলে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, দুর্বল নেতাদের নাম প্রকাশে অনাগ্রহ দেখালেও তিনি জি-৭ জোটে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অনুপস্থিতি নিয়ে আক্ষেপ করেন। পাশাপাশি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দেওয়া রাজকীয় নৈশভোজের স্মৃতিও তুলে ধরেন।
ইসরায়েল প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি না থাকলে আজ ইসরায়েলের কোনও অস্তিত্ব থাকত না।’ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, ‘ভালো, তবে আমাদের তাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।’
ইরান চুক্তি নিয়ে নিজের দলের কট্টরপন্থী রিপাবলিকানদেরও সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আগে আমি যাদের সম্মান করতাম, এখন আর তাদের করি না। ওরা সব কট্টরপন্থি।’ একই সঙ্গে তার দাবি, সমঝোতার ফলাফল কার্যত ইরানের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণ’ এবং সেখানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’।
তবে সীমাহীন ক্ষমতার দাবি করলেও অর্থনীতিকে নিজের সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে স্বীকার করেছেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারত। তেলের দাম কমে যাওয়া এবং শেয়ারবাজারের উত্থানকে তিনি নিজের সিদ্ধান্তের সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার একটিই প্রাথমিক ইচ্ছা... আমি কখনোই প্রয়াত এবং মহান হারবার্ট হুভার হতে চাই না।’ যুক্তরাষ্ট্রের ৩১তম প্রেসিডেন্ট হারবার্ট হুভারের নাম বিশ্বব্যাপী মহামন্দার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এদিকে ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই বিতর্কিত নথিটি প্রকাশ করে এর লেখককে ইতিহাসবিদ বলে দাবি করেন। তবে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বইয়ের লেখকদের দাবি, নথিটি কোনো ইতিহাসবিদের লেখা নয়। এটি তৈরি করেছেন বিখ্যাত গলফার গ্যারি প্লেয়ারের ব্যক্তিগত সহকারী ও ঘনিষ্ঠ একজন সহযোগী।
বইটিতে বলা হয়েছে, ওই নথির উপসংহারে দাবি করা হয় যে বৈশ্বিক পরিসরে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগে যে সাহস ট্রাম্প দেখিয়েছেন, তা তাকে ‘এই গ্রহে এযাবৎকালের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত করেছে’।