
আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকটের চাপ কমাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্য পূরণে ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন বা রুফটপ সোলার ব্যবস্থাকে কার্যকর উপায় হিসেবে দেখছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের ৩১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়েও কাজ চলছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) আয়োজনে ৩১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনবিষয়ক মতবিনিময় সভায় এ পরিকল্পনার কথা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ নিয়ে সাধারণ মানুষকে যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, আগামী গ্রীষ্মে তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সরকার কাজ করছে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে মাত্র দুই মাসের মধ্যে একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত এ নীতিমালা প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন, সক্ষমতা ও বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার ও ইউজিসি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্বন ক্রেডিট অর্জনে সহায়তা করবে বিদ্যুৎ বিভাগ। এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে পারলে একটি কার্বন ক্রেডিট পাওয়া যায়। নির্ধারিত যাচাই ও স্বীকৃতি প্রক্রিয়া শেষে এসব ক্রেডিট বিক্রির সুযোগও রয়েছে।
দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে আগামী ৩ ও ৪ নভেম্বর ঢাকায় ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো’ আয়োজনের কথা জানান তিনি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিষয়ে উপাচার্যদের অংশগ্রহণে বিশেষজ্ঞ সভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ সভায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
সভাপতির বক্তব্যে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করা এবং সংশ্লিষ্টদের মতামত জানার উদ্দেশ্যে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইউজিসি ইতোমধ্যে একটি জরিপ চালিয়েছে। উদ্যোগটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে একটি দলও গঠন করা হয়েছে। দলটি ইউজিসির নিজস্ব ভবনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ খতিয়ে দেখবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিচালন ব্যয় কমাতে অপারেটিং এক্সপেনডিচার বা ওপেক্স (OPEX) মডেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিচালন ব্যয়ের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল পরিশোধে ব্যয় হয়। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো গেলে এ ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো সম্ভব।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) ওপেক্স মডেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, সেখানে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে।
কার্বন ক্রেডিট অর্জনের বিষয়টি শুরু থেকেই পরিকল্পনায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পাশাপাশি এর মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কতটা কমছে, তা পরিমাপের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কার্বন ক্রেডিট অর্জনের প্রক্রিয়াতেও ইউজিসি প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান আরও জানান, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, চুক্তির খসড়া ও প্রাসঙ্গিক তথ্য সরবরাহ করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনই উদ্যোগ নিলে আগামী এক মাসের মধ্যে কাজ শুরু করা সম্ভব।
সভায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডিন অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব তাহমিলুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও ওপেক্স মডেলে এর সম্প্রসারণ নিয়ে পৃথক দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব, যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সভাপতি ও বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আবদুর রাজ্জাক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এনামুল্লাহ এবং ইউজিসি সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলাম।
এ ছাড়া ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন, অধ্যাপক মো. মেহেদী হাসান খান ও অধ্যাপক ড. মো. আসলাম হোসেন, কমিশনের আইসিটি বিভাগের পরিচালক মো. ওমর ফারুকসহ ৩১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ইউজিসির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।