
অবশেষে আইনের জালে ধরা পড়লেন বিপুল দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোলের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সুদূর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র সাবেক এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এদিকে বৈশ্বিক আলোড়ন সৃষ্টি করা এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি গণমাধ্যমের সামনে নিশ্চিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও। সাবেক এই ক্ষমতাধর আইজিপিকে দেশে ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া ও প্রত্যর্পণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ জুন পাঠানো একটি প্রাতিষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে বেনজীর আহমেদকে আটকে রাখার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। মূলত বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি সুনির্দিষ্ট ও বড় ধরনের দুর্নীতির মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বর্তমানে তিনি দুবাই পুলিশের কঠোর হেফাজতে রয়েছেন। তাঁকে দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র তৈরির কাজ অলরেডি শুরু করেছে দুদক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের বিবরণ দিয়ে আরও যোগ করেন, গ্রেপ্তারের দিন থেকে ঠিক ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের ব্যবহার করে দুবাই সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রত্যর্পণ প্রস্তাব তৈরি ও অনুমোদন করবে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে তা আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হবে। একই সময়ে এনসিবি (পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখা) আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বিক সমন্বয় রক্ষা করবে। অতি দ্রুতই বেনজীর আহমেদকে দেশের মাটিতে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেন মন্ত্রী।
প্রশাসনিক রেকর্ড অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। এর পূর্বে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবেও অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। তবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের যে সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, সেই তালিকায় বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর আহমেদের আকাশচুম্বী অবৈধ সম্পদের খতিয়ান ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। এর পরপরই তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কেলেঙ্কারি ফাঁসের এই পর্যায়ে তিনি গোপনে দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে দেশে একাধিক মামলা দায়েরসহ আদালতের পক্ষ থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল।