
বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তনের আভাস মিলেছে মার্কিন শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে। ২০০২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী মানুষের মনোভাব নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা চালানো এই সংস্থার ইতিহাসে এবারই প্রথম দেখা গেল, পৃথিবীর সিংহভাগ দেশের মানুষ আমেরিকার চেয়ে চীনের প্রতি বেশি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছেন। বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার এই দৌড়ে ওয়াশিংটনকে টপকে বেইজিংয়ের এই শীর্ষস্থান অর্জনকে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পরিচালিত এই সুবিশাল গবেষণায় বিশ্বের ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তারা অত্যন্ত ইতিবাচক, আংশিক ইতিবাচক, আংশিক নেতিবাচক নাকি চরম নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
২৫টি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে চীন
জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জরিপভুক্ত ৩৬টি রাষ্ট্রের মধ্যে ২৫টি দেশেই আমেরিকার তুলনায় চীনের প্রতি মানুষের সমর্থন ও ইতিবাচক মনোভাব বেশি। বিশেষ করে স্পেন, ইতালি, গ্রিস, কানাডা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলোতে চীনের প্রতি জনসমর্থন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে মাত্র ৬টি দেশে এখনও আমেরিকার জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে; দেশগুলো হলো—পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান ও ইসরাইল।
এই অভূতপূর্ব ফলাফলের বিষয়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের জোনাথন শুলম্যান বলেন:
"অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তায় পতন দেখা গেছে। তবে তখন চীনের জনপ্রিয়তা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সমান বা কিছুটা কম ছিল। এবারই প্রথম এত বড় ব্যবধানে চীনের পক্ষে জনমত গড়ে উঠেছে।"
মধ্যম আয়ের দেশে রেকর্ড উচ্চতায় চীন, ব্যতিক্রম সিঙ্গাপুর
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতালি, স্পেন, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া এবং তুরস্কে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বা রেকর্ড উচ্চতায় অবস্থান করছে। পিউ-এর গবেষকদের মতে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোর নাগরিকরা চীনের প্রতি অনেক বেশি ইতিবাচক, পক্ষান্তরে উচ্চ আয়ের ধনী দেশগুলোতে বেইজিংয়ের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বেশি কাজ করে। তবে উচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশ হওয়া সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা চীনের প্রতি ব্যতিক্রমীভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য লক্ষ করা গেছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত পাকিস্তানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চীনের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও ইতিবাচক মানসিকতা প্রকাশ করেছেন; অথচ জাপানে এই হার মাত্র ১১ শতাংশ।
ট্রাম্প বনাম শি জিনপিং: বিশ্বনেতাদের প্রতি আস্থা কার কত?
বিশ্ব রাজনীতিতে সঠিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন নেতার ওপর বিশ্ববাসী বেশি ভরসা রাখছেন—এমন প্রশ্নে অবতীর্ণ হয়েছিলেন উত্তরদাতারা। জরিপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থার তুলনা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, সার্বিকভাবে দুই নেতার প্রতি আস্থার পারদ তলানিতে থাকলেও, অধিকাংশ দেশের মানুষ ট্রাম্পের চেয়ে শি জিনপিংয়ের ওপর বেশি ভরসা রাখছেন।
শি জিনপিং: তাঁর ওপর সর্বোচ্চ ৮৩ শতাংশ আস্থা দেখিয়েছেন পাকিস্তানের নাগরিকরা, আর সর্বনিম্ন মাত্র ৭ শতাংশ আস্থা এসেছে জাপান থেকে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি সর্বোচ্চ ৬৮ শতাংশ আস্থা প্রকাশ করেছে ফিলিপাইনের নাগরিকরা, আর সবচেয়ে কম মাত্র ৪ শতাংশ আস্থা দেখা গেছে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে।
অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ, কমেছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ব্যবধান
যদিও বৈশ্বিক নাগরিকরা এখনও মনে করেন যে নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি মার্কিন প্রশাসনের শ্রদ্ধা চীনের চেয়ে তুলনামূলক বেশি, তবে এই দুই দেশের মধ্যকার ব্যবধান আগের চেয়ে অনেক সংকুচিত হয়ে এসেছে। পাশাপাশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই জরিপে। মধ্যম আয়ের দেশগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশ উত্তরদাতার অভিযোগ—আমেরিকা অন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত নাক গলায় ও হস্তক্ষেপ করে। যেখানে চীনের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তুলেছেন মাত্র ৪৫ শতাংশ মানুষ।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটনের অস্থির ও অনিশ্চিত বৈদেশিক নীতি, সরাসরি সামরিক আগ্রাসন এবং বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কারণেই বিশ্ববাসী এখন বিকল্প পরাশক্তি হিসেবে বেইজিংকে বেছে নিচ্ছে। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং শি জিনপিংয়ের কঠোর একদলীয় শাসনব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। আর সে কারণেই চীনের প্রতি সামগ্রিক ইতিবাচক মনোভাব বাড়লেও, দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর মানুষের আস্থার হার এখনও তুলনামূলকভাবে কম।