
জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি আর সংকটের এই সময়ে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের এক সৃজনশীল স্কুলশিক্ষক। ডিজেলের উচ্চমূল্য যখন সেচ কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন তিনি পোড়া মোবিলের সঙ্গে নিজের আবিষ্কৃত একটি বিশেষ রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করেছেন বিকল্প জ্বালানি। মনির হোসেন নামে ওই উদ্যোক্তার এই উদ্ভাবন স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
‘এমএডি’ পদ্ধতি: সাশ্রয়ী সেচের নতুন দিগন্ত
মনির হোসেন তার এই ফর্মুলার নাম দিয়েছেন ‘ম্যাথড অব অল্টারনেটিভ ডিজেল’ বা এমএডি। এর মূল উপকরণ হলো পোড়া মোবিল এবং তার নিজস্ব তৈরি একটি রাসায়নিক, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘বুস্টার’। মনির হোসেনের দাবি অনুযায়ী, মাত্র ৫ লিটার পোড়া মোবিলের সঙ্গে ১০০ মিলিলিটার বুস্টার মিশিয়ে দিলে তা সাধারণ ডিজেলের চেয়েও বেশি সময় সেচ পাম্প চালাতে সক্ষম। দীর্ঘদিনের নিরলস গবেষণার পর এখন তিনি এটি বাণিজ্যিকভাবে কৃষকদের সরবরাহ করছেন।
মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয়তা ও কৃষকদের অভিজ্ঞতা
দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর চর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের পর মাঠ সেচ চলছে এই বিকল্প জ্বালানিতে। বর্তমানে ওই চরের প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি স্যালো ইঞ্জিন এই পদ্ধতিতে সচল রয়েছে। মানিকদিয়াড় গ্রামের কৃষক আবু বক্কর জানান, ডিজেলের বদলে পোড়া মোবিল ব্যবহার করতে পারায় তাদের সেচ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আরেক কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ ও ডিজেল সংকটের এই সময়ে মনিরের বুস্টার তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। উদ্ভাবকের দাবি, এই পদ্ধতির ফলে উপজেলায় প্রতিদিন কৃষকদের প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকার জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে।
উদ্ভাবনের নেপথ্যে দীর্ঘ সংগ্রাম
মনির হোসেন ২০০৭ সাল থেকে শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষি ও ডিজেল ইঞ্জিনের বিকল্প নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এক পর্যায়ে গবেষণায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকেও সরে দাঁড়ান। ২০১৯ সালে চীনে অনুষ্ঠিত একটি কর্মশালায় অংশ নিয়ে ডিজেল ইঞ্জিনের ফুয়েল ও কম্প্রেশন সিস্টেম নিয়ে সম্যক ধারণা পান তিনি। দেশে ফিরে ৪ থেকে ৫টি উপাদানের মিশ্রণে কাজ শুরু করলেও শুরুতে নানা কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়। তবে হাল না ছেড়ে অবশেষে এক মাস আগে ১২টি উপাদানের সমন্বয়ে তিনি শতভাগ সফলতা পাওয়ার দাবি করেন।
বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের পর্যবেক্ষণ
বিকল্প এই জ্বালানি নিয়ে কৃষকরা উচ্ছ্বসিত হলেও কৃষি বিভাগ ও যন্ত্র বিশেষজ্ঞরা কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
বিএমএআই-এর বক্তব্য: গাজীপুরের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের (বিএআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নুরুল আমিন জানান, ডিজেল ইঞ্জিন অন্য কোনো জ্বালানিতে চলার কথা নয়। তবে কৃষকরা কীভাবে এটি করছেন তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যবহৃত রাসায়নিকটি ইঞ্জিনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কি না, তা ল্যাব পরীক্ষার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ: উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রেহেনা পারভীন জানিয়েছেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং তারা এটি খতিয়ে দেখছেন। তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সাশ্রয়ী কৃষির স্বপ্ন
পরীক্ষাগারে এই বুস্টারের চূড়ান্ত ছাড়পত্র মিললে এটি বাংলাদেশের সেচ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সাবধান করে দিয়েছেন যে, পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এমন দাহ্য পদার্থের মিশ্রণ ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে ইঞ্জিনের ক্ষতি কিংবা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে কি না, সেটি ভাববার বিষয়। আপাতত, ডিজেল সংকটের এই সময়ে মনির হোসেনের ‘বুস্টার’ কুষ্টিয়ার কৃষকদের জন্য এক বড় ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।