
রাজধানী ঢাকার অপরাধ সাম্রাজ্য এখন এক অস্থির সময় পার করছে। শহরটিকে ১০টি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে ভাগ করে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিলেও, খোদ ‘গডফাদারের’ নির্দেশ অমান্য করে একে অপরের এলাকায় হানা দিচ্ছে বিভিন্ন গ্রুপ। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে শুরু হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, যার বলি হতে হচ্ছে খোদ শীর্ষ সন্ত্রাসীরাই।
রক্তাক্ত সংঘাতের ধারাবাহিকতা
আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াইয়ে সবশেষ বলি হয়েছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন। মঙ্গলবার নিউমার্কেট এলাকায় তাকে হত্যা করা হয়। এর কিছুদিন আগে পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে। কেবল সন্ত্রাসীরাই নয়, সাধারণ ব্যবসায়ী ও যুবকরাও এই অস্থিরতার শিকার হচ্ছেন। রায়েরবাজারে জোড়া খুন এবং এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে কুপিয়ে জখম করার নেপথ্যেও কাজ করছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই নিয়ন্ত্রণহীন দ্বন্দ্ব।
কারাগারের ভেতর থেকে ব্লুপ্রিন্ট
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই এক চাঞ্চল্যকর ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক প্রভাবশালী এক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় আয়োজিত সেই বৈঠকে ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী অংশ নেন। সেখানে পুরনো সব বিবাদ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শপথ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে তারা ঢাকাকে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেন।
কার হাতে কোন এলাকা?
সূত্র অনুযায়ী, রাজধানীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ভাগ করা হয়েছে এভাবে:
মিরপুর: কিলার আব্বাস ও তাজ। পাশাপাশি শাহাদাতকে তার নিজস্ব শক্তিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
মহাখালী, বনানী ও গুলশান: এই অভিজাত এলাকার দায়িত্ব পেয়েছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমাম।
মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট: সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে ঢাবি আবাসিক এলাকা ও এলিফ্যান্ট রোডের নিয়ন্ত্রণ পান।
ফার্মগেট ও তেজগাঁও: ১৯৯৭ সালে সরকার কর্তৃক ঘোষিত এক লাখ টাকা পুরস্কারপ্রাপ্ত জনৈক ‘গডফাদার’ সামলাচ্ছেন এই শিল্পাঞ্চল।
পুরান ঢাকা: এখানে মামুনের আধিপত্য ছিল, কিন্তু নভেম্বরে তিনি খুন হওয়ার পর থেকে শাহেদ সেখানে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
অন্যান্য: মালিবাগ-মৌচাকের দায়িত্বে রাসু, মোহাম্মদপুর-শ্যামলী এলাকায় পিচ্চি হেলাল এবং বাড্ডা-উত্তরা এলাকায় পৃথক সন্ত্রাসীদের আধিপত্য রয়েছে।
চুক্তিভঙ্গ ও অস্থিরতার কারণ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, একটি অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে এই এলাকা ভাগ করা হয়েছিল। শর্ত ছিল, কেউ কারো সীমানা লঙ্ঘন করবে না। কিন্তু চাঁদাবাজির অর্থ ভাগাভাগি এবং ক্ষমতার লিপ্সায় সেই সমঝোতা টিকছে না। গডফাদারের কড়া নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যখনই একে অপরের স্বার্থে আঘাত হানছে, তখনই সংঘাত রাজপথে ছড়িয়ে পড়ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন রাজধানীর জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।