
রান্নার স্বাদকে ঘিরে বিশ্বের নানা দেশের পরিচয় আলাদা হলেও মসলার ব্যবহার অনেক সময়ই সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের সবচেয়ে বড় পরিচায়ক হয়ে ওঠে। কোথাও ঝালের মাত্রা নির্ভর করে মরিচের তীব্রতায়, আবার কোথাও মসলার মিশ্রণে তৈরি হয় জটিল ও গভীর স্বাদ। সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মসলা ব্যবহারে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে ভারত, এরপরই অবস্থান করছে বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়া।
২০২১ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মোট মসলা ব্যবহারের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৩৬২ কিলোটন। এর মধ্যে একাই ভারতের হিস্যা প্রায় ৫ হাজার ৩৯৪ কিলোটন, যা বৈশ্বিক ব্যবহারের প্রায় ৩৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়া পরবর্তী অবস্থানে থাকলেও শীর্ষ তিন দেশ মিলে বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি নিয়ন্ত্রণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়া এখনো বিশ্বের মসলা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। মোট উৎপাদনের প্রায় ৯৪ শতাংশই আসে এই অঞ্চল থেকে। শুধু ব্যবহার নয়, উৎপাদন ও রপ্তানিতেও ভারত শীর্ষে রয়েছে, যা দেশটিকে বৈশ্বিক মসলা বাজারে এককভাবে প্রভাবশালী অবস্থানে রেখেছে।
রান্নার স্বাদে ঝালের রাজনীতি: কোন দেশ কতটা ঝালপ্রেমী
ঝাল ও মসলাদার খাবারের তালিকায় বিভিন্ন দেশের অবস্থান শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, বরং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও প্রতিফলন। বিশ্বজুড়ে করা একটি খাদ্যাভ্যাসভিত্তিক বিশ্লেষণে ঝালপ্রিয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে নাইজেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ঘানা, মেক্সিকো ও চীন।
একই সঙ্গে মাথাপিছু মসলা ব্যবহারের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে গায়ানা, ভুটান ও বেনিন। বিশেষ করে গায়ানায় মাথাপিছু মসলা গ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেকটাই ব্যতিক্রম।
ভারত থেকে নাইজেরিয়া: মসলার বৈচিত্র্যে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসলা ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে ভারতের রান্না বৈচিত্র্যে ভরপুর। এখানে ঝাল শুধু মরিচনির্ভর নয়, বরং ধনিয়া, জিরা, এলাচ ও লবঙ্গের মতো মসলার সমন্বয়ে তৈরি হয় স্বাদের গভীরতা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঝালের মাত্রাও ভিন্ন, যা ভারতীয় রান্নাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
থাইল্যান্ডে খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য মিষ্টি, টক ও ঝালের মিশ্রণ। বিখ্যাত ‘টম ইয়াম’ স্যুপ থেকে শুরু করে সালাদ পর্যন্ত প্রতিটি পদেই থাকে ভারসাম্যপূর্ণ স্বাদ।
মেক্সিকোতে মরিচের ধোঁয়াটে ব্যবহার খাবারে তৈরি করে এক ধরনের স্তরযুক্ত স্বাদ, যা খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূত হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার রান্নায় গাঁজানো মরিচের পেস্ট খাবারে ঝালের পাশাপাশি মিষ্টি ও উষ্ণতার অনুভূতি যোগ করে। কিমচি ও ঝাল রামেন এখানকার সবচেয়ে পরিচিত পদ।
চীনের সিচুয়ান অঞ্চলের খাবারে ব্যবহৃত বিশেষ মরিচ মুখে তৈরি করে এক ধরনের অবশ অনুভূতি, যা স্থানীয়ভাবে ‘মালা’ স্বাদ নামে পরিচিত।
আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় ‘বেরবেরে’ নামের মসলার মিশ্রণ খাবারে গভীর ঝালের পাশাপাশি ভেষজ সুবাস যোগ করে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের জ্যামাইকায় ‘স্কচ বনেট’ মরিচ দিয়ে তৈরি জার্ক চিকেন ধোঁয়াটে ও তীব্র স্বাদের জন্য পরিচিত।
পেরুর খাবারে ‘আজি আমারিলো’ মরিচ ব্যবহৃত হয়, যা ঝালের চেয়ে বেশি উষ্ণতা ও সতেজতা এনে দেয়।
মালয়েশিয়ার রান্নায় ‘সাম্বাল’ নামের মরিচের চাটনি প্রায় সব খাবারের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়, যা খাবারকে ঝাঁঝালো ও তীব্র স্বাদ দেয়।
অন্যদিকে নাইজেরিয়ার রান্নায় ঝালের মাত্রা অনেক বেশি সরাসরি। সেখানে ‘পেপার স্যুপ’ ও বিভিন্ন স্টুতে প্রচুর পরিমাণে কাঁচা মরিচ ব্যবহার করা হয়, যা ঝালপ্রেমীদের জন্য এক চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা তৈরি করে।