
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নৃশংসতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং তাদের নিজ মাতৃভূমিতে টেকসই প্রত্যাবাসন—দুটি প্রক্রিয়াই একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) চলমান বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থনের কথাও জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ফরেন সার্ভিস একাডেমি মিলনায়তনে ‘দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট: একটি সমন্বিত পদ্ধতির সন্ধান’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসইভাবে নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি অটুট রয়েছে।
প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বহুপাক্ষিক উদ্যোগের পাশাপাশি আরও জোরালো আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাস্তবসম্মত ও টেকসই পথ খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায় চীন, আসিয়ান, জাতিসংঘ ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে কাজ করতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।’
রাখাইন এখনো প্রত্যাবাসনের উপযোগী নয়
রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতিকে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা হিসেবে তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা বর্তমানে মিয়ানমার রাষ্ট্রের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে এবং সেসব এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। একই সময়ে তাতমাদাও ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকায় অঞ্চলটি প্রত্যাবাসনের উপযোগী জায়গার বদলে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এগুলো আমাদের কৌশলের পাদটীকা নয়, বরং এর কেন্দ্রীয় প্রতিবন্ধকতা।’
তবে পরিস্থিতি কঠিন হলেও এসব বাধা অতিক্রম করা অসম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।
‘প্রত্যাবাসন সম্ভব, প্রশ্ন হলো কীভাবে’
দীর্ঘদিন ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে প্রয়োজনীয় ধৈর্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে বলে মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবির।
তিনি ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এবং ১৯৯২ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন।
তার মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা এরই মধ্যে দেখিয়েছে যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব।
তিনি বলেন, এটি ‘যদি’র প্রশ্ন নয়। এটি ‘কীভাবে’ এবং ‘কত দ্রুত’- সেটির প্রশ্ন।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় কৌশলের আওতায় আনার উদ্যোগ
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার জাতীয় রোহিঙ্গা কৌশল প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তার ভাষ্য, এর মাধ্যমে দেশের কূটনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ একই সঙ্গে একটি মানবিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে তার অবস্থান বজায় রাখবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
হুমায়ুন কবির বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের অবস্থানের কারণে মানবিক সংকটের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়ছে।
রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা এবং কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ও সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। কক্সবাজারের জনগণের নিরাপত্তা ও সুযোগ নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব। আমরা দু’টির মধ্যে কোনো একটি বেছে নেব না।’
সরকারের নীতির কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে প্রত্যাবাসনকেন্দ্রিক কর্মসূচির দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে চায় সরকার। এর উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি যেন স্থায়ী রূপ না নেয়।
আন্তর্জাতিক দায়ভার প্রসঙ্গে
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক দায়ভার ভাগাভাগির বিষয়েও বক্তব্য দেন হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সমন্বয় অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি কাঠামোবদ্ধ ও পূর্বানুমানযোগ্য আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগি নিশ্চিত করার জন্য চাপও চালিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাস্তবে যে সংকট একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব, তার পুরো ভার কোনো একটি দেশের এককভাবে বহন করা উচিত নয়।
মিয়ানমারের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের কাঠামোর মধ্যে রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কঠোরভাবে এবং দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
এর পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
বহুপাক্ষিক উদ্যোগের পাশাপাশি আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে ঢাকা। সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে এ বিষয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানান হুমায়ুন কবির।
সব কূটনৈতিক ও নিরাপত্তার বিকল্প রাখবে বাংলাদেশ
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি যেদিকেই গড়াক, তার সঙ্গে কার্যকরভাবে মানিয়ে নিতে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সব কূটনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিকল্প উন্মুক্ত রাখতে চায় বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে যাতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়া যায়, সে জন্য দেশকে প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে হতাশ না হয়ে নতুন দৃঢ়তা নিয়ে কাজ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান হুমায়ুন কবির। এ সময় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের অতীত সাফল্যের কথাও স্মরণ করেন তিনি।
সমাপনী অধিবেশনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, সম্মেলনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এএসএম আলী আশরাফ, বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের সদস্য, শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী, ফরেন সার্ভিস একাডেমির প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তা এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।