
নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনে গুলি করে শুভ (৩০) নামে এক যুবককে হত্যার ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে ডিবি পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সুমন (৪৫), সিয়াম আহমেদ সিজান (২১) ও সোহান (২৪) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যায় ব্যবহৃত একটি বিদেশি পিস্তল ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে দুজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
তবে হত্যার তদন্তে অগ্রগতি হলেও শুভর শেষযাত্রা থমকে আছে অন্য একটি কারণে। নিহতের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা-বাবার পরস্পরবিরোধী দাবির কারণে তার মরদেহ দাফন নাকি সৎকার হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। শেষ পর্যন্ত বাবা-মায়ের বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা-বাবার ভিন্ন দাবি
নিহতের মা দাবি করছেন, তার ছেলে শুভ ওরফে বিল্লাল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাই তাকে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করতে চান তিনি।
অন্যদিকে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাসের বক্তব্য, তার ছেলে হিন্দু ধর্মে জন্মেছেন। ফলে তিনি হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে ছেলের মরদেহ চিতায় দাহ করতে চান।
দুই পক্ষের এমন ভিন্ন অবস্থানের কারণে হত্যার ছয় দিন পরও শুভর মরদেহ শেষকৃত্যের অপেক্ষায় রয়েছে। একটি লাশবাহী গাড়িতে মরদেহটি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার কম্পাউন্ডের ভেতরে রাখা হয়েছে।
আদালতে শুনানি, মরদেহ হিমাগারে রাখার সিদ্ধান্ত
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) শুভর মরদেহ কোন ধর্মীয় রীতিতে দাফন বা সৎকার করা হবে, সে বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত জানানোর কথা ছিল।
শুনানি শেষে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদার আদালত মরদেহ হিমাগারে সংরক্ষণের আদেশ দেন। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ আদালত পুলিশের পরিদর্শক আবদুস সামাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তালাকের সময় শুভর বয়স ছিল চার বছর
শুভ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মফিজুর রহমান জানান, শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাস ও মা আয়েশা বেগমের ২০০৩ সালে তালাক হয়। মুসলমান হওয়ার পর আয়েশা বেগম নামটি গ্রহণ করেন।
তাদের বিচ্ছেদের সময় শুভর বয়স ছিল চার বছর। ওই সময় শুভ, তার মা, তার ছোট এক ভাই ও ছোট এক বোন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুভ এফিডেভিটের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘বিল্লাল’ নাম নেন। পরে মুসলিম রীতি অনুযায়ী কাবিনের মাধ্যমে বিয়ে করেন তিনি। তার স্ত্রী জুথিও মুসলিম এবং তাদের দুই সন্তান রয়েছে।
‘আমরা দুই ভাই একসঙ্গে মুসলমান হই’
শুভর ভাই ইব্রাহিম বলেন, তারা দুই ভাই একসঙ্গেই মুসলমান হন। পরে তাদের সুন্নতে খাতনা করা হয়। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকার রওজাতুস সালেহীন নামের একটি মাদ্রাসায় তারা পড়াশোনাও করেন।
তবে এসব দাবির বিপরীতে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাসের বক্তব্য, তার ছেলে হিন্দু ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এ কারণেই তিনি ছেলের মরদেহ হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাহ করার দাবি জানাচ্ছেন।
ঢাকা মেডিকেলের হিমাগারে মরদেহ
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি সাজেদুর রহমান বলেন, শুভ হিন্দু নাকি মুসলিম—এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি জানান, আদালত এ বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন। এর আগে মরদেহ হিমাগারে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আপাতত শুভর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান ওসি।
৪ সেপ্টেম্বর রাতে গুলি ও ছুরিকাঘাতে হত্যা
পুলিশ জানায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে শুভর গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে। সেখান থেকে পাঁচটি গুলির খোসা পাওয়া যায়। এ ছাড়া মরদেহের পাশ থেকে ১০০টি ইয়াবা ট্যাবলেটও উদ্ধার করা হয়।
ইয়াবার বিনিময়ে ডেকে আনার দাবি পুলিশের
পুলিশের দাবি, ১০টি ইয়াবা ট্যাবলেট দেওয়ার বিনিময়ে শুভর এক সহযোগীকে ব্যবহার করে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়েছিল। সেখানে তাকে গুলি করার পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ডিবি পুলিশ ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত করে বলে জানায়। এরপর সুমন, সিয়াম আহমেদ সিজান ও সোহানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত বিদেশি পিস্তল ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, নিহত শুভর বিরুদ্ধেও থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে।