
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ আরও চড়াল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবস্থান—ইরানের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাব তিনি নাকচ করে দিয়েছেন এবং স্পষ্ট করে বলেছেন, পরমাণু চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ প্রত্যাহারের প্রশ্নই আসে না। একই সময়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির এই সময়কে কাজে লাগিয়ে তারা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রস্তুত করছে। নতুন করে হামলা হলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ‘অনির্দিষ্টকালের’ যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, যা গত সপ্তাহে একতরফাভাবে ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নজরদারি এবং তার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধকে ঘিরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) হোয়াইট হাউস জানায়, ট্রাম্প ও তার জাতীয় নিরাপত্তা দল ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধ শেষ করার একটি নতুন প্রস্তাব পেয়েছে। যদিও প্রস্তাবের বিস্তারিত কোনো পক্ষই প্রকাশ করেনি।
গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবটিতে যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর কথা বলা হয়েছে এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরে কোনো এক সময়ে করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে ট্রাম্প এই প্রস্তাবে ‘অসন্তুষ্ট’ বলে জানিয়েছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দুই মাস ধরে চলা এই সংঘাতের অবসানে ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ না করা এবং ওয়াশিংটনের উদ্বেগ দূর না করা পর্যন্ত নৌ-অবরোধ চালু থাকবে।
গত বুধবার (২৯ এপ্রিল) অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান অবরোধ তুলে নেওয়ার লক্ষ্যে একটি চুক্তি করতে আগ্রহী, যা তার ভাষায় ‘বোমা হামলার চেয়েও বেশি কার্যকর’।
তিনি আরও দাবি করেন, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরান অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে পারছে না, ফলে দেশটির তেল সংরক্ষণাগার ও পাইপলাইনগুলো ‘বিস্ফোরণের দ্বারপ্রান্তে’ পৌঁছেছে। ট্রাম্প বলেন, ‘বোমাবর্ষণের চেয়ে অবরোধটা কিছুটা বেশি কার্যকর। তাদের দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে চলেছে। ওরা পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তারা এখন মীমাংসা করতে চায়। তারা চায় না আমি অবরোধটা অব্যাহত রাখি। তবে আমি অবরোধ তুলতে চাই না, কারণ আমি চাই না ওদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকুক।’ তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে ফোনে আলোচনা চলছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য এখন ‘আত্মসমর্পণ’ স্বীকার করার সময় এসেছে।
অচলাবস্থা কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের ওপর একটি ‘স্বল্প ও শক্তিশালী’ হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে বলেও জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। এই হামলার মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানো এবং আরও নমনীয় অবস্থান নিতে চাপ সৃষ্টি করার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারির জবাবে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রস্তুত করছে। আইআরজিসির এক মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আবারও কোনো আগ্রাসন চালায়, তবে তাদের ইরানের সম্পূর্ণ নতুন সামরিক কৌশল ও নজিরবিহীন প্রতিরোধ মোকাবিলা করতে হবে।’
এদিকে, এই যুদ্ধ নিয়ে প্রথমবারের মতো কংগ্রেসের শুনানিতে অংশ নিয়ে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়ান যুক্তরাষ্ট্রের সমরমন্ত্রী পিট হেগসেথ। এক ডেমোক্র্যাট সদস্য এই সংঘাতকে ‘কৌশলগত ভুল’ এবং ‘চোরাবালি’ হিসেবে অভিহিত করেন।
যুদ্ধে মার্কিন সেনা নিহতের ঘটনায় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও ওঠে। শুনানিতে এক আইনপ্রণেতা অভিযোগ করেন, ঘাঁটিটি ইরানের লক্ষ্য তালিকায় থাকা সত্ত্বেও সেখানে সেনা মোতায়েন করে ঝুঁকি বাড়ানো হয়েছে। তবে হেগসেথ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সেনাদের নিরাপত্তায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
পেন্টাগনের শীর্ষ আর্থিক কর্মকর্তা জুলস ‘জেই’ হার্স্ট কংগ্রেসকে জানান, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
এই সংঘাতে ইতোমধ্যে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং শতাধিক সেনা আহত হয়েছেন। বিপুল এই ব্যয়ের বড় অংশ গেছে অস্ত্র ও ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম পুনর্গঠনে, যা এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স