
ইউরোপজুড়ে জেঁকে বসা নজিরবিহীন তীব্র তাপপ্রবাহে প্রতিনিয়ত ভেঙে চলেছে আবহাওয়ার পুরোনো সব রেকর্ড। অতিরিক্ত এই দাবদাহের কবলে পড়ে কেবল ফ্রান্সেই স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় এক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির জনস্বাস্থ্য বিভাগ। শুধু তা-ই নয়, স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে শুরু করে আল্পস পর্বতমালা অঞ্চলের একাধিক রাষ্ট্রে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা 'পাবলিক হেলথ ফ্রান্স' এক বিবৃতিতে জানায়, গত ২৪ জুন থেকে শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহে এ পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রাণ হারানো এই নাগরিকদের প্রায় ৮৫ শতাংশেরই বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি ছিল। যেসব এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছিল, সেখানেই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে রাজধানী প্যারিস ও এর পার্শ্ববর্তী ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলের বাসাবাড়িগুলোতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে যে, সামাজিকভাবে একাকী ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা মানুষের জীবন রক্ষায় আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে যে, যেহেতু এই পরিসংখ্যান প্রাথমিক, তাই প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বিগত কয়েক দিন ধরে ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রান্তে থার্মোমিটারের পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলেও আজ রোববার আবহাওয়া কিছুটা সহনীয় হয়েছে। তবে ইউরোপের অন্যান্য অংশে গরমের এই তাণ্ডব অব্যাহত রয়েছে।
জার্মান আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, শনিবার দেশটির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের ময়েকার্ন-ড্রেভিৎস অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা জার্মানির ইতিহাসে নতুন এক রেকর্ড। এদিকে ডেনমার্কে ১৮৭৪ সালের পর এই প্রথম সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখা গেছে। চেক প্রজাতন্ত্রে পারদ ছুঁয়েছে ৪০ দশমিক ৯ ডিগ্রি এবং স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভায় ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম রাত অতিবাহিত হয়েছে।
চলতি এই সংকটের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জার্মানির গ্রিন পার্টির সাবেক সংসদীয় নেতা ক্যাটরিন গ্যোরিং-একহার্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “এটি আর মনোরম গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট।”
জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের তৈরি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছাড়া এমন প্রলয়ংকরী তাপপ্রবাহ তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব। তাঁরা আরও জানান, বর্তমান সময়ে রাতে অস্বাভাবিক রকমের উচ্চ তাপমাত্রা বজায় থাকার ঝুঁকি আজ থেকে ২০ বছর আগের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন হ্রাস ও নদী বিপর্যয়
তীব্র দাবদাহের বহুমুখী প্রভাব পড়েছে ইউরোপের শিল্প ও প্রাকৃতিক পরিবেশেও। হাঙ্গেরিতে দানিয়ুব নদীর পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে ওঠায় পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি রিঅ্যাক্টরের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই কারণে সুইজারল্যান্ডের বেজনাউ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হয়েছে।
ইতালির মিলান, রোম, তুরিন, ভেনিস, জেনোয়া, ফ্লোরেন্স ও বোলোনিয়াসহ মোট ১৮টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দেশটির প্রধান নদী পো-এর পানি প্রবাহ আশঙ্কাজনক স্তরে নেমে যাওয়ায় সমুদ্রের নোনা পানি ভেতরের দিকে চলে আসছে। ফলে স্থানীয় কৃষিকাজ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
যোগাযোগ ও জনজীবনে স্থবিরতা
অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে মহাদেশটির সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। জার্মানির একটি অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়কে গরমের চোটে ফাটল দেখা দেওয়ায় সেটির একটি লেন আংশিক বন্ধ করে দেওয়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় রেলসেবা ডয়চে বান যাত্রীদের দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিট বিনামূল্যে পরিবর্তনের সুবিধা দিয়েছে।
একই সাথে বিপুল জনসমাগম এড়াতে বিভিন্ন দেশে সামাজিক ও ক্রীড়া অনুষ্ঠানের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের লোজান প্রাইড শোভাযাত্রায় অতিরিক্ত পানির বুথ ও জরুরি চিকিৎসাকর্মী মোতায়েন করা হয়। মিলানে প্রাইড মিছিলের সময় পিছিয়ে বিকেল ৫টায় নেওয়া হয়। এছাড়া ফ্রাঙ্কফুর্টে আয়োজিত আয়রনম্যান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তীব্র গরমের কারণে সাইক্লিং ও দৌড়ের নির্ধারিত দূরত্ব কমিয়ে আনা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা ব্যাখ্যা করেছেন, গ্রিক বর্ণ ‘ওমেগা’র মতো আকৃতিবিশিষ্ট একটি উচ্চচাপ বলয় বা ‘ওমেগা ব্লক’ তৈরি হওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে গরম বাতাস ইউরোপের বায়ুমণ্ডলে আটকে রয়েছে। এর ফলেই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছে। তবে সপ্তাহের শেষ নাগাদ বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রসহ ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।