
শাকিরার নাম উঠলেই বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের মনে ভেসে ওঠে তার কণ্ঠ, গ্ল্যামার আর ফুটবল বিশ্বকাপের স্মরণীয় মঞ্চগুলো। তবে চলমান বিশ্বকাপ ঘিরে যখন তার পারফরম্যান্স নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা তুঙ্গে, তখন অনেকেই ভুলে যান— প্রায় দুই দশক আগে এই কলম্বিয়ান পপতারকা বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড়-বিধ্বস্ত জনপদে গিয়ে শিশুদের কষ্টের গল্প শুনেছিলেন, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন একজন মানবিক দূত হিসেবে।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে বিশ্বজুড়ে যেমন ফুটবল উন্মাদনা চলছে, তার রেশ লেগেছে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আয়োজনে পারফর্ম করে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন কলম্বিয়ান পপসংগীত তারকা শাকিরা। তবে তার গান ও পরিবেশনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক।
সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তার পরিবেশনা ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ‘বডি ডাবল’ ব্যবহারের গুঞ্জন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকের দাবি, মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে দেখা যাওয়া ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে শাকিরা নন, বরং তার মতো দেখতে অন্য কেউ পারফর্ম করেছেন। যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি।
এদিকে স্পেনে কর ফাঁকি সংক্রান্ত মামলাও দীর্ঘদিন ধরে শাকিরার ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। স্পেনে বসবাসকালে কর ফাঁকির অভিযোগে আইনি জটিলতায় জড়ানোর পর তিনি দেশটির কর কর্তৃপক্ষকে ‘ইনকুইজিশন’ বা ধর্মীয় আদালতের সঙ্গে তুলনা করে সমালোচনা করেছিলেন। পরে আইনি সমঝোতা ও জরিমানা পরিশোধের মাধ্যমে বার্সেলোনায় চলা সেই মামলার নিষ্পত্তি হয়।
ব্যক্তিগত জীবনেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শাকিরা। স্প্যানিশ ফুটবল তারকা জেরার্ড পিকের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর দুজনের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। বিশেষ করে সাবেক সঙ্গীকে ইঙ্গিত করে প্রকাশিত কিছু গানের কারণে ভক্ত ও সমালোচকদের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।
এ ছাড়া নিজের বিশ্বভ্রমণভিত্তিক কনসার্ট ট্যুরের সমাপ্তি উপলক্ষে স্পেনে ব্যক্তিগত অর্থায়নে একটি অস্থায়ী স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেও আলোচনার জন্ম দিয়েছেন এই শিল্পী।
তবে বিশ্বমঞ্চের এসব বিতর্কের বাইরেও বাংলাদেশের সঙ্গে শাকিরার রয়েছে এক বিশেষ স্মৃতি। ২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর বৈশ্বিক শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি।
১৬ ডিসেম্বর ২০০৭ ঢাকায় পৌঁছেই তিনি দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শনে যান। পটুয়াখালীর সিডর-আক্রান্ত অঞ্চলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও শিশুদের গল্প শুনে তাদের বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করেন।
সফরকালে সিডরে মা-বাবাকে হারানো ১১ বছর বয়সী নিপা নামের এক শিশুর সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শাকিরা জানান, মেয়েটি তাকে একটি বাংলা শোকগাথা শুনিয়েছিল, যার অর্থ ছিল— ‘মা, তুমি যেখানেই থাকো, আমাকে একটি চিঠি লেখো।’ সেই স্মৃতি আজও তাকে নাড়া দেয় বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
শিশুদের দৃঢ় মনোবল তাকে মুগ্ধ করেছিল। সে সময় শাকিরা বলেছিলেন, ‘তবে খানিক স্বস্তির ব্যাপার ছিল এখানে যে, এসব দুর্যোগ, দুঃখ আর শোকের মাঝে আমি এই আধা-ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলটিতে শিশুদের খেলতে, গাইতে আর হাসতে দেখেছি। শিশুদের মুখে ডাক্তার ও নার্স হওয়ার স্বপ্নের কথা শুনে আমার খুব ভালো লেগেছে..., তাদের সবারই ইতিবাচক স্বপ্ন ছিল।’
সিডরের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে তিনি গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। শাকিরার ভাষায়, ‘পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখে আমি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তাদের যা কিছু ছিল, সব শেষ হয়ে গেছে..., এই দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এতগুলো মানুষের জীবনহানি..., যে মায়েরা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন, তাদের মুখ আমি কখনো ভুলব না।’
বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে তিনি রাজশাহীতেও ইউনিসেফ পরিচালিত একটি প্রকল্প পরিদর্শন করেন। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন। শিশুদের কল্যাণে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার দীর্ঘদিনের; মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ‘পিয়েস দেসকালসোস’ (বাংলা অর্থ: খালি পা) নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ইউনিসেফ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সফরটি ছিল অনেকটাই ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে করা। প্রচারের আলোয় আসার চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রা ও দুর্যোগ-পরবর্তী বাস্তবতা কাছ থেকে দেখতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন শাকিরা।
বাংলাদেশ ছাড়ার আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সহায়তার আহ্বানও জানিয়েছিলেন এই শিল্পী। তিনি বলেছিলেন, দেশের শিশু ও সাধারণ মানুষের জন্য আরও বেশি মনোযোগ ও সহায়তা প্রয়োজন। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশ্বকাপের ঝলমলে মঞ্চে আজ আবার আলোচনায় শাকিরা। তবে বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন বিশ্বখ্যাত পপতারকা নন; দুর্যোগের সময় পাশে দাঁড়ানো এক মানবিক মুখও।