.webp)
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে নাগা ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) কামজং ও উখরুল জেলায় সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। একই দিনে কামজং জেলার চাসাদ এলাকায় অন্তত ১০টি বাড়ি ও ২০টি দোকানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
সহিংসতার জেরে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে প্রশাসন। পাশাপাশি চাসাদ এলাকায় জনসমাগম ও চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে কাঙপোকপি জেলায় ২৪ ঘণ্টার বন্ধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আদিবাসী ঐক্য কমিটি (সিওটিইউ)।
গুলিতে নিহত কুকি নারীসহ পাঁচজন
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে কামজং জেলার চাসাদ এলাকায় গুলিতে নিহত হন ২৩ বছর বয়সি মাইকেল এনগাম্মিনলেন হাওকিপ। সন্দেহভাজন সশস্ত্র ব্যক্তিদের ছোড়া গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
একই দিন উখরুল জেলার টিএম কাসোমের কাছে ইয়াওলেন এলাকায় হামলার শিকার হন ৪০ বছর বয়সি সন্দীপ রাই। চার চাকার একটি গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় সন্দেহভাজন সশস্ত্র ব্যক্তিরা। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে।
এর আগে শুক্রবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে চাসাদ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান পাঁচ সন্তানের জননী ডমখোনেই তোউথাং নামের এক কুকি নারী। তাঁর মৃত্যুর ঘটনাও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে।
এ ছাড়া শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কামজং জেলার ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নিংচৌ গ্রামে গুলিতে নিহত হন দুই নাগা বাসিন্দা। তাঁরা হলেন ৩৫ বছর বয়সি এনগাচানসো নিংশেন ও ৪৮ বছর বয়সি লেইশিশান লেইশাদাং। তাঁদের ওপর কারা হামলা চালিয়েছে কিংবা হামলার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
সর্বশেষ এসব ঘটনায় কামজং জেলায় চারজন এবং প্রতিবেশী উখরুল জেলায় একজন নিহত হয়েছেন।
চাসাদে ১০ বাড়ি ও ২০ দোকানে আগুন, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা
সহিংসতার পাশাপাশি চাসাদ ও আশপাশের এলাকায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। শনিবার অন্তত ১০টি বাড়ি ও ২০টি দোকানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত এবং কতজন বাসিন্দা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে চাসাদ পুলিশ গেট জংশনের আশপাশে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কামজং জেলা প্রশাসন। গত ৯ অক্টোবর জারি করা এক আদেশে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এল এন কাশুং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারা প্রয়োগ করেন।
আদেশ অনুযায়ী, ওই জংশনের ৪০০ মিটারের মধ্যে পাঁচজন বা তার বেশি মানুষের জমায়েত, অস্ত্র বহন এবং বাড়ির বাইরে চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ বিধিনিষেধ বহাল থাকবে।
তবে নিরাপত্তাকর্মী, দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেট, জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি এবং বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ কার্যকর হবে না।
কাঙপোকপিতে ২৪ ঘণ্টা লকডাউন, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
চাসাদে হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি উখরুল জেলার ইয়াওলেন ও ইম্ফল-তেংনৌপাল সড়ক এলাকায় সমন্বিত হামলার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সিওটিইউর সদর হিলস শাখা। শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কাঙপোকপি জেলায় ২৪ ঘণ্টার সম্পূর্ণ বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছে। তবে জরুরি চিকিৎসাসেবাকে এই কর্মসূচির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, ডমখোনেই তোউথাং ও মাইকেল এনগাম্মিনলেন হাওকিপের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে কুকি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (কেডব্লিউইউ)। সংগঠনটি এ ঘটনায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩ ও ১০৫ ধারায় মামলা দায়েরের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইন্ডিয়া রিজার্ভ ব্যাটালিয়নের (আইআরবি) পোস্ট সরিয়ে নেওয়া এবং হত্যাকাণ্ডগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
নতুন করে সহিংসতা, প্রাণহানি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মণিপুরের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তবে হামলাগুলোর পেছনে কারা জড়িত, সেগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং সহিংসতার প্রকৃত কারণ কী—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।