ভারতের আসাম রাজ্যে দুই দিনের উচ্ছেদ অভিযানে ১১০০টিরও বেশি মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়েছে রাজ্য সরকার। গত ১৭ অক্টোবর নগাঁও, গোলাঘাট ও হোজাই জেলায় ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। পরদিন রোববার নগাঁও জেলার লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আরও ৬০০টির বেশি পরিবারের বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
সরকারি কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আসাম বন বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ বিষয়ে তথ্য জানিয়েছেন। প্রশাসনের ভাষ্য, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো বনভূমি দখল করে বসবাস করছিল। দুই দিন ধরে চলা এ অভিযানের অংশ হিসেবে এসব বাড়িঘর সরিয়ে দেওয়া হয়।
তিন জেলায় ৫৪৭ পরিবার উচ্ছেদ
১৭ অক্টোবর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আসামের তিন জেলায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ওই দিন মোট ৫৪৭টি পরিবারকে তাদের বসতভিটা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে নগাঁও জেলায় ৩৩৬টি, গোলাঘাটে ৫৯টি এবং হোজাই জেলায় ১৫২টি পরিবার রয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলিম।
লুতুমারি এলাকার বাসিন্দারা কয়েক দশক ধরে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৩০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে বসবাস করে আসছিলেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, তাঁরা জবরদখলকারী নন। বরং সরকারই তাঁদের সেখানে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।
রোববার নিজের বাড়ি ভেঙে ফেলার পর লুতুমারির ৪৪ বছর বয়সী বাসিন্দা আবদুন নূর বলেন, ‘১৯৭৪ সালে সরকার আমাদের এখানে পুনর্বাসিত করেছিল। আমরা মূলত কাছের জুরিয়া শহরের বাসিন্দা। আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভূমিহীন ছিলেন বলে সরকার আমাদের এখানে বসতি গড়ে দিয়েছিল। সব মিলিয়ে ৩০০টি ভূমিহীন পরিবারকে চার বিঘা করে জমি দেওয়া হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে গৌহাটি হাইকোর্টে মামলা করেছিলাম। কিন্তু আদালত আমাদের কোনো প্রতিকার দেননি।’
নূরের দাবি, অভিযানের সময় ১০টিরও বেশি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি অর্ধশতাব্দীরও বেশি পুরোনো। তিনি বলেন, ‘আমরা বন বিভাগে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতাম। এ কারণেই অনেককে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল।’
পুনর্বাসনের ইতিহাস তুলে ধরে উচ্ছেদ বন্ধের দাবি
লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাসিন্দাদের উচ্ছেদ বন্ধে গত জুনে আসাম সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপলস। সংগঠনটির বক্তব্য ছিল, ওই এলাকার চারটি গ্রামের মানুষকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে চালু হওয়া ‘টংগিয়া’ বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির অধীনে সেখানে বসতি গড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে তাঁদের সাধারণ বনভূমি দখলকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যথাযথ নয় বলে মনে করে সংগঠনটি।
টংগিয়া পদ্ধতিতে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে বসবাসকারী মানুষ বন পরিচর্যার কাজ করতেন। পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান গাছের সঙ্গে খাদ্যশস্যও উৎপাদন করতেন তাঁরা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ শাসকেরা এ পদ্ধতি চালু করে। পরবর্তী সময়ে আসামের কয়েকটি এলাকাতেও এর প্রয়োগ হয়।
লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সংশ্লিষ্ট চারটি গ্রাম হলো কন্দর্প লংজাপ, পদুমনি, হাতিজুর ও ৯ নম্বর খেরোনি।
বিজেপির ১০ বছরের শাসনে প্রায় ১৯ হাজার পরিবার উচ্ছেদ
সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, আসামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) গত ১০ বছরের শাসনামলে সরকারি জমি থেকে প্রায় ১৯ হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাজ্যের রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব তৈরি করা হয়েছে।
উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর বেশির ভাগই মুসলিম বলে ওই পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।