
উত্তেজনাপূর্ণ কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে জেনেভায় অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারমাণবিক সংলাপে মিলেছে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’র ইঙ্গিত। মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি এ তথ্য জানিয়েছেন। তবু সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত এড়াতে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে উভয় পক্ষই শিগগিরই আলোচনায় ফেরার কথা জানিয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
জেনেভায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আলবুসাইদি বলেন, উভয় দেশ নিজ নিজ রাজধানীতে পরামর্শ শেষে ‘শিগগিরই’ আবার আলোচনায় বসবে। পাশাপাশি আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি জানান, আলোচনায় ‘ভালো অগ্রগতি’ হয়েছে। কিছু বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হলেও বেশ কয়েকটি ইস্যুতে মতভেদ রয়ে গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে পরবর্তী দফা সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংলাপের অগ্রগতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ইরানে হামলার হুমকি বাস্তবায়নের ঝুঁকি কমাতে পারে। যদিও ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি মোতায়েনের নির্দেশ ইতোমধ্যে দিয়েছেন ট্রাম্প। জবাবে তেহরান সতর্ক করেছে, হামলা হলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তেহরান বারবার দাবি করেছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। তবুও পারমাণবিক অস্ত্র না থাকা সত্ত্বেও অস্ত্রমানের কাছাকাছি পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা একমাত্র দেশ ইরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, আলোচনায় তেহরান শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের অধিকারের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা এবং ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানোর মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে আলোচনায় কিছু নমনীয়তার প্রস্তাবও এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। আলোচিত বিকল্পগুলোর একটি হলো তিন থেকে পাঁচ বছরের বিরতির পর আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় সীমিত পরিসরে সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া। আরাগচি বলেছেন, যেকোনো চুক্তির বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। ইরানি টেলিভিশনে তিনি মন্তব্য করেন, নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি এর প্রধান রাফায়েল গ্রোসিও এই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। বিবিসি জানায়, দুই দফায় পরোক্ষ আলোচনা হয়, সকালে তিন ঘণ্টার বৈঠক এবং সন্ধ্যায় সংক্ষিপ্ত আরেকটি বৈঠক। ফলাফল নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াশিংটনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
চুক্তি সম্পাদনে ট্রাম্প কোন শর্তে সম্মত হতে পারেন, তা এখনো অনির্দিষ্ট। আট মাস আগে ইসরায়েল ইরান উত্তেজনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর পরও নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ কেন প্রয়োজন হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। তেহরান ইতোমধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে মিলিশিয়া ও ইয়েমেনে হুতিদের প্রতি সমর্থন বন্ধের প্রস্তাব নাকচ করেছে।
গত মঙ্গলবার কংগ্রেসে দেওয়া স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প ইরান প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা ‘শিগগিরই’ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম হবে, যদিও বিস্তারিত দেননি। তিনি আরও বলেন, গত বছরের হামলার পর ইরান পুনরায় পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করার চেষ্টা করছে এবং ‘বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষককে’ পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেওয়া যাবে না।
তবে ওই ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক মাধ্যমে আরাগচি লিখেছিলেন, ইরান ‘কোনও পরিস্থিতিতেই’ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
মার্কিন গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ না করা প্রশাসনিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কিংবা পারমাণবিক স্থাপনায় প্রাথমিক হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিলেন, যাতে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। এমনকি আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়িকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান সতর্ক করেছেন, ইরানে হামলা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং এতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, জেনারেল ড্যান কেইন মনে করেন এটি ‘সহজেই জেতা’ সম্ভব।
অন্যদিকে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলে পাল্টা আঘাত হানা হবে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত আঞ্চলিক দেশগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, ইরানে হামলা বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তাদের মতে, কেবল বিমান শক্তি দিয়ে দেশটির নেতৃত্ব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
সূত্র: বিবিসি