
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত খুনিকে আটক করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তের বাড়িঘর ভাঙচুর করে এবং অগ্নিসংযোগে তিনটি ঘর ও আসবাবপত্র পুড়িয়ে দেয়। পরে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজিত জনতার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
উত্তেজিত জনতার ছোড়া ইটের আঘাতে পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকসহ ১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। এ সময় পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ মোট ৬টি সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয় এবং পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। আহত পুলিশ সদস্যদের আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি আরও জানান, দায়িত্ব অবহেলার কারণে আদিতমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজমুল হককে থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়েছে।
নিহত শিশুর পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে ধর্ষণের বিষয়টি ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। মরদেহ লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
আটক অভিযুক্ত হলেন ফলিমারী গ্রামের ধনঞ্জয় বর্মণের ছেলে বিধান চন্দ্র বর্মণ (২৩)।
নিহত শিশু একই গ্রামের কৃষক নলিনী চন্দ্র বর্মণের মেয়ে নন্দিনী রানী (৭)। সে স্থানীয় ব্র্যাক প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পুলিশ ও পরিবার জানায়, প্রতিদিনের মতো সোমবার বিকেলে শিশুটি খেলাধুলার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ি না ফেরায় পরিবারের লোকজন বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। পুরো রাতজুড়ে অনুসন্ধান চললেও তার সন্ধান মেলেনি। পরদিন সকালে স্থানীয়রা গ্রামের জাবেদ আলীর ভুট্টাখেতে ভুট্টাগাছ ভাঙা অবস্থায় দেখতে পেয়ে সন্দেহ করেন। পরে ভুট্টাখেতের ভেতরে একটি গর্তে বস্তাবন্দী অবস্থায় শিশুটির মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।
শিশুটির বাবা নলিনী বর্মণ বলেন, আমার সঙ্গে গ্রামের কারও কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আমি একজন কৃষক, খুব সাধারণ জীবনযাপন করি। সোমবার দুপুরেও মেয়েকে নিয়ে একসঙ্গে খাবার খেয়েছিলাম। আমার ছোট মেয়েটিকে জোরপূর্বক ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আমি বিচার চাই।
তিনি অভিযোগ করেন, মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর সোমবার রাত ১১টার দিকে আদিতমারী থানায় অভিযোগ করতে গেলে ওসি বিষয়টি আমলে নেননি। ওসি যদি রাতে ব্যবস্থা নিতেন তাহলে হয়তো আমার মেয়েকে জীবিত ফিরে পেতাম, তিনি বলেন।
তিনি আরও বলেন, গ্রামের বাইরের এলাকা থেকে দলে দলে লোক এসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে এবং পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর হামলা চালিয়ে সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করে। একই সঙ্গে অভিযুক্তের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করা হয়। আমি পুলিশের সঙ্গে উপস্থিত ছিলাম, তিনি বলেন।
শিশুটির মা সাবিত্রী রানী বলেন, নন্দিনী প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির বাইরে খেলতে যেত। সোমবার বিকেলেও খেলতে গিয়েছিল। বাড়ির পাশে কয়েকটি ভুট্টাখেত রয়েছে। হয়তো প্রলোভন দেখিয়ে বা জোরপূর্বক তাকে ধরে নিয়ে ভুট্টাখেতে আটকে রেখে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।
আদিতমারী থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) তুহিন মিয়া জানান, এ ঘটনায় নিহত শিশুর বাবা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কিনা তা জানতে আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর হামলাকারী এবং সরকারি গাড়ি ভাঙচুরকারীদের ভিডিও ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ওসি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করায় তাকে ক্লোজড করা হয়েছে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।