
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত সিপাহি-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলার দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে শনিবার (৭ নভেম্বর) দেওয়া এক বাণীতে তিনি এ মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে দিবসটি পালনে জাতীয়ভাবে নেওয়া সব কর্মসূচির সফলতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাণীতে তিনি বলেন, ‘যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল এবং দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল, ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। দেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক দিনটি ছিল বাংলাদেশের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দিন।’
বাংলাদেশের জন্ম, মুক্তিযুদ্ধসহ জাতীয় ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একটি প্রবাদবাক্যের তাৎপর্য তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, অতীতকে ভুলে গেলে দু’চোখই অন্ধ’। তাঁর মতে, সারাক্ষণ অতীতের ইতিহাস নিয়ে ব্যস্ত থাকাটা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে ইতিহাসের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা কাজে না লাগানোও বড় ধরনের ঐতিহাসিক ভুল।
বাণীতে তারেক রহমান উল্লেখ করেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্রের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর পরাজিত অপশক্তি পরবর্তী সময়ে মহাজোটের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। পিলখানায় বিডিআরের সদর দপ্তরে পরিকল্পিত সেনা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়েছিল। একই সময়ে জনগণের ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। হাজারো শহিদের আত্মত্যাগ এবং ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা অর্জন করা। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা সুরক্ষার লড়াই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের সর্বস্তরের মানুষ যেভাবে স্বাধীনতা রক্ষার দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিল, ১৯৭৫ সালেও সিপাহি ও সাধারণ মানুষ একইভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছিল।
ভবিষ্যতে যেন কোনো পক্ষ দেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে কিংবা বাংলাদেশকে অন্যের অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, ৭ নভেম্বরের দিনে সেটিই প্রধান অঙ্গীকার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারেক রহমান। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তারেক রহমানের মতে, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে হলে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের চেতনাকে গভীরভাবে ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তাঁবেদার অপশক্তির বিরুদ্ধে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান—ইতিহাসের এসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও আন্দোলনের পেছনে মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল অভিন্ন। স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের সব গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলাই ছিল এসব আন্দোলনের মূল প্রত্যাশা।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। দিবসটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য স্মরণ করে দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কণ্ঠে তিনি একটি প্রত্যয়ী স্লোগান উচ্চারণের আহ্বান জানান—‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের চেতনা বাংলাদেশের আগামী দিনের পথচলায় প্রেরণা জোগাবে এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।