
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে এখন এক প্রলয়ংকরী পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দামামা বাজছে। সংঘাতের পঞ্চম দিনে এসে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি করে খোদ ইরানের রাজধানী তেহরানে প্রথমবার বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনী। একই সঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ জোরদারের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে খার্গ দ্বীপগামী একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে গুলি ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে মার্কিন পরাশক্তি।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঝে তেহরান অবশ্য সদিচ্ছার পরিচয় দিয়ে তাদের হেফাজতে থাকা এক মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দিয়েছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে উল্টো ইরান এখন বাহরাইন ও কুয়েতে পাল্টা আঘাত হানার পাশাপাশি গোটা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে সমস্ত জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
খালি ট্যাংকারে হেলফায়ার মিসাইল ও উপকূলে মার্কিন আঘাত
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকালে মার্কিন সামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলমান সংঘাতের পঞ্চম দিনে তারা একটি খালি তেল ট্যাংকারকে হামলা চালিয়ে অকেজো করে দিয়েছে। সমুদ্রসীমায় চলাচলের সময় জাহাজটি মার্কিন বাহিনীর একাধিক সতর্কবার্তা আমল না দেওয়ায় এর স্মোকস্ট্যাকে (ধোঁয়া নির্গমন নল) সরাসরি ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করে ব্যাপক হামলা চালায় ওয়াশিংটন। তারও কয়েক ঘণ্টা আগে দিনের প্রথমার্ধে একটি পৃথক অভিযানে ইরানের ‘গ্রেটার তুনব’ দ্বীপে অবস্থিত ক্রুজ মিসাইল মজুদের গুদাম ও উৎক্ষেপণ সাইটগুলো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় মার্কিন সেনারা।
পাল্টা জবাবে জ্বলছে বাহরাইন-কুয়েত, তেহরানের দাবি ৩৫ মৃত্যু
আমেরিকার এই আগ্রাসনের জবাবে চুপ করে থাকেনি তেহরানও। তারা বাহরাইন এবং কুয়েতের বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই সুনির্দিষ্ট পাল্টা আঘাতে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, বিগত কয়েক দিনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর চালানো নির্বিচার হামলায় এ পর্যন্ত ৩৫ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩০০ জনেরও বেশি ইরানি নাগরিক।
উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর ও ভেঙে পড়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় এই ভয়াবহ ও ধারাবাহিক হামলার তরঙ্গ আছড়ে পড়ল, যা দুই দেশকে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সেন্টকমের বক্তব্য ও আক্রান্ত অঞ্চলসমূহ
আমেরিকার সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বুধবার গভীর রাতে এক বিবৃতিতে জানায়, সর্বশেষ দফার এই জোরালো হামলাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের সেই সব সামরিক সক্ষমতা ও পরিকাঠামোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া, যা হরমুজ প্রণালির মতো আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে অবাধে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছিল।
অন্যপক্ষে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির প্রধান বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসের পাশাপাশি আহভাজ শহরের আশেপাশের মোট চারটি স্থানে মার্কিন যুদ্ধবিমান আঘাত হেনেছে। এছাড়া দক্ষিণ ইরানের সিরিক এবং কেশম দ্বীপের নিকটবর্তী অঞ্চলেও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গত শনিবার তেহরানের পক্ষ থেকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা আসার পর থেকেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এই পাল্টাপাল্টি রক্তক্ষয়ী হামলা মারাত্মক রূপ নেয়। এর ফলে এই প্রধান সামুদ্রিক জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই একক পথটি দিয়েই সম্পন্ন হতো।