
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে ইরান। প্রায় ৩০ কোটি ডলার মূল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করার সক্ষমতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে যুদ্ধের প্রথম দিকেই জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত আরটিএক্স করপোরেশনের ‘এন/টিপিওয়াই–২’ রাডার এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ধ্বংস হয়ে গেছে। পরে এক মার্কিন কর্মকর্তাও ‘থাড’–এর একটি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ’ জানিয়েছে, জর্ডানে ইরানের অন্তত দুটি হামলার খবর পাওয়া গেছে—একটি ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং অন্যটি ৩ মার্চ। সে সময় উভয় হামলাই প্রতিহত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটির সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি কেন্দ্রের উপপরিচালক রায়ান ব্রবস্ট বলেন, ‘যদি ধ্বংসের বিষয়টি সত্যি হয়ে থাকে, তবে থাড রাডারের ওপর এই হামলা হবে ইরানের অন্যতম সফল আক্রমণ।’
তবে তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং তাদের মিত্রদের কাছে আরও রাডার রয়েছে, যা আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষা দিতে পারে। ফলে একক কোনো রাডার হারালে সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
মার্কিন ‘টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড ব্যবস্থার মূল কাজ হলো বায়ুমণ্ডলের উচ্চসীমায় পৌঁছানোর আগেই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্যাট্রিয়ট ব্যাটারির তুলনায় আরও জটিল ও শক্তিশালী হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব। তবে বর্তমানে ‘এন/টিপিওয়াই–২’ রাডারটি অকেজো হয়ে যাওয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের দায়িত্ব অনেকটাই প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ওপর এসে পড়বে। অথচ প্যাট্রিয়টের ‘পিএসি–৩’ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ইতিমধ্যেই কমে গেছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া ও গুয়ামসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আটটি থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি ব্যবস্থার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি ডলার, যার মধ্যে কেবল রাডারটির দামই প্রায় ৩০ কোটি ডলার।
প্রতিষ্ঠানটির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ টম কারাকো বলেন, ‘এগুলো অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য কৌশলগত সম্পদ এবং এটি হারানো এক বিরাট ধাক্কা।’
তিনি আরও জানান, ২০১২ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর নয়টি থাড ব্যাটারি থাকার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে রয়েছে মাত্র আটটি। ফলে অতিরিক্ত কোনো ‘টিপিওয়াই–২’ রাডার হাতে নেই।
একটি থাড প্রতিরক্ষা ব্যাটারিতে সাধারণত ৯০ জন সেনা সদস্য, ট্রাকে স্থাপিত ছয়টি লঞ্চার, মোট ৪৮টি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র (প্রতিটি লঞ্চারে আটটি), একটি টিপিওয়াই–২ রাডার এবং একটি ফায়ার কন্ট্রোল ও যোগাযোগ ইউনিট থাকে। লকহিড মার্টিন করপোরেশনের তৈরি প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
প্যাসিফিক ফোরাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো উইলিয়াম অ্যালবার্ক বলেন, ‘আপনি যদি সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চান, তাহলে এটি এমন একটি সরঞ্জাম, যা আপনাকে অবশ্যই যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন রাখতে হবে।’
অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার জেমস মার্টিন সেন্টার ফর নন–প্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষণায় বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুতেই কাতারে স্থাপিত ‘এএন/এফপিএস–১৩২’ রাডারও ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। থাড ব্যবস্থার মতো এটি স্থানান্তরযোগ্য নয়; বরং স্থায়ীভাবে স্থাপিত একটি রাডার। দূরবর্তী হুমকি শনাক্ত করাই এর প্রধান কাজ, তবে লক্ষ্যভেদী অস্ত্র নির্দেশনায় এটি ততটা কার্যকর নয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টা হামলার কারণে ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। এতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখা কখনো কখনো কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতিতে থাড ও প্যাট্রিয়টের মতো উন্নত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে।
এদিকে গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে লকহিড ও আরটিএক্সসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। পেন্টাগন এখন এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর অস্ত্র উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে।