
মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তির রাজনীতিতে থাকার অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তাঁর অভিযোগ, মাদক কারবারের পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কেউ মাদক ব্যবসা করলে তার পরিচয় প্রকাশ করে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ইশরাক হোসেন।
তিনি জানান, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান ও প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। তাঁর ভাষ্য, দেশের যেসব অঞ্চলে মাদকের প্রবণতা বেশি, সেখানে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে একটি অসাধু চক্র মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ায় অনেক সময় এসব কারবারি নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পায়।
ইশরাক আরও বলেন, সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন পদ্ধতিতে মাদক দেশের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ কাজে কয়েকটি পরিচিত পরিবহন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার কথাও শোনা যাচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু নামসর্বস্ব ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, একটি গোষ্ঠী ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে মাদক ছড়িয়ে সমাজ ও জাতিকে ধ্বংসের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
মাদকের কারণে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে সংসদ সদস্য বলেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ ভয়াবহ ও নৃশংস অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড এবং বহুল আলোচিত ঐশীর ঘটনাকে তিনি এর দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, মাদকের নেতিবাচক প্রভাব থেকেই এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। তিনি বলেন, দেশে মাদক সহজে পাওয়া যাওয়ায় এর বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে গাঁজা, ইয়াবাসহ দামি বিভিন্ন ধরনের মাদক খুব সহজেই সংগ্রহ করা যাচ্ছে। ইয়াবার বিস্তার এখন শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নেই; গ্রামাঞ্চল, পাড়া ও মহল্লাতেও পৌঁছে গেছে। এমনকি অনলাইনে ফরমাশ দিলে বাসায় মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে।
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদক এবং অপরাধের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। মাদক ব্যবসা কিংবা অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের স্থায়ী কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলে তারাও নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় বদলে ফেলে। সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণে শূন্য সহনশীলতার নীতি নিয়েছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোনো মাদক কারবারি যেন বাড়তি সুবিধা নিতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
মাদকবিরোধী অভিযানের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অভিযানে মাদকসেবী, বাহক ও ছোট পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা আটক হলেও বড় কারবারিরা অনেক ক্ষেত্রেই অধরা থেকে যাচ্ছে। মাদক পাচারে অপরাধীরা এখন নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করছে। কখনো দোকান কিংবা ভ্রাম্যমাণ দোকানের আড়ালে, কখনো মানুষের শরীরে এবং কখনো যাত্রীবাহী যানবাহনের গোপন প্রকোষ্ঠে মাদক বহন করা হচ্ছে। এমনকি পাকস্থলী ও মুঠোফোনের ব্যাটারি রাখার জায়গা ব্যবহার করেও ইয়াবা পাচারের ঘটনা ঘটছে বলে জানান তিনি।
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ আরও বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কেবল সরকারের কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ এবং মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক ডা. এম এ মোহিত কামাল।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন একাত্তর টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান শাহ আজিজুর রহমান কিরণ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি মো. মুন্না হুসাইন এবং ইডেন মহিলা কলেজ বিতর্ক দলের দলনেতা মাসনুন নাবিলা আলম। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সাবেক জাতীয় বিতার্কিক মো. কাউছার আলম।
‘মাদককে না বলি, মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি’ স্লোগান সামনে রেখে আয়োজিত সেমিনারটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ডিবেটিং সোসাইটি এবং ইডেন মহিলা কলেজ ডিবেটিং ক্লাব।