
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়ন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। সমালোচনার মুখে বদলি কমিটি থেকে অস্পষ্ট ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার বিধান বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি বদলি প্রক্রিয়াকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ করতে সাতটি নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন মহলে আপত্তি ওঠার পর সম্প্রতি সংশোধিত নীতিমালা জারি করা হয়েছে। এতে উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয়—এই চার স্তরের কমিটির কাঠামো বহাল থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ের কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’র পরিবর্তে দুজন করে বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত কয়েক মাসে প্রেষণ ও সংযুক্তির মাধ্যমে ঢাকাসহ বিভিন্ন মহানগরের বিদ্যালয়ে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক পদায়নের অভিযোগ সামনে আসে। পরে ১৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে বদলি-সংক্রান্ত অনিয়ম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ২১ জুন বদলি প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে বিকেন্দ্রীকরণ করে চার স্তরের কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে অনলাইন পদ্ধতির পরিবর্তে ম্যানুয়াল ব্যবস্থা চালু এবং কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
সমালোচনার মূল কারণ ছিল, ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে, তা নীতিমালায় স্পষ্ট ছিল না। এতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বহিরাগত বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি হয়। পরে সেই বিধান সংশোধন করে বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়।
সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা বা থানা কমিটির সভাপতি থাকবেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং বিভাগীয় কমিটির সভাপতি বিভাগীয় কমিশনার।
জাতীয় কমিটির নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের নীতিমালায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব সভাপতি থাকলেও এখন থেকে এ দায়িত্ব পালন করবেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি)। কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিদ্যালয়) এবং সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন)।
নতুন নীতিমালায় শিক্ষক বদলির জন্য সাতটি বাধ্যতামূলক শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। চাকরির ন্যূনতম দুই বছর পূর্ণ না হলে কোনো সহকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকা বদলির আবেদন করতে পারবেন না। বদলির পর তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পুনরায় বদলির সুযোগ থাকবে না। শুধু শূন্য পদের বিপরীতে বদলি করা যাবে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের আবেদন ছাড়া সাধারণভাবে বদলি করা যাবে না। তবে জনস্বার্থে বা প্রশাসনিক প্রয়োজনে জাতীয় কমিটির অনুমোদন নিয়ে বদলি করা যাবে।
এ ছাড়া যেসব বিদ্যালয়ে পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক রয়েছেন অথবা শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০-এর বেশি, সেসব বিদ্যালয় থেকে বদলি করা যাবে না। একই বিদ্যালয় থেকে একাধিক আবেদন এলে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অগ্রাধিকার পাবেন। একটি বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ তিনজন শিক্ষককে সংযুক্তির মাধ্যমে পদায়ন করা যাবে। পাশাপাশি সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নারী শিক্ষকদের স্থায়ী ঠিকানা বা স্বামীর কর্মস্থলের নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে বদলির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় কমিটিগুলো প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈঠক করে বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তি করবে। একই উপজেলা, জেলা বা বিভাগের মধ্যে বদলির আদেশ সংশ্লিষ্ট কমিটি জারি করবে। অন্যদিকে আন্তঃবিভাগীয় ও সিটি করপোরেশন এলাকার বদলির সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় কমিটি। নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের লটারির মাধ্যমে পদায়নের দায়িত্ব জেলা কমিটির কাছেই বহাল থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, সংশোধিত নীতিমালা কার্যকর হলে শিক্ষক বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় তদবির, অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
রেডফ্ল্যাগ শব্দ: নেই