
বলিউড অভিনেতা নানা পাটেকরের মৃত্যুর পর চলচ্চিত্রজগতে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। সহকর্মী ও ভক্তরা স্মরণ করছেন তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবন। এর মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্তের করা পুরোনো যৌন হেনস্থার অভিযোগ, যা ২০১৮ সালে বলিউডে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল।
২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির একটি গানের শুটিংকে কেন্দ্র করে নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছিলেন তনুশ্রী। প্রায় এক দশক পর প্রকাশ্যে আসা সেই অভিযোগ ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে বিতর্কের জন্ম দেয় এবং দেশটিতে ‘মি টু’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সময় আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
গানের শুটিং ঘিরে অভিযোগ, সেট ছেড়ে চলে যান তনুশ্রী
তনুশ্রীর অভিযোগ ছিল, ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির সংশ্লিষ্ট গানে নানা পাটেকরের থাকার কথা ছিল না। কিন্তু শুটিংয়ের সময় তিনি সেটে এসে অভিনেত্রীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। নাচের কৌশল শেখানোর অজুহাতে নানা তাঁর হাত ধরে টানেন, ধাক্কা দেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে শরীরে স্পর্শ করেন বলে অভিযোগ করেন তনুশ্রী।
অভিনেত্রীর আরও দাবি ছিল, পরে নাচের দৃশ্যের ধরন পরিবর্তন করে নানা পাটেকরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই গানের কোরিওগ্রাফার ছিলেন গণেশ আচার্য। তনুশ্রীর অভিযোগ, এ ঘটনায় গণেশও নানাকে সমর্থন করেছিলেন।
ঘটনার পর শুটিং ছেড়ে সাজঘরে চলে যান তনুশ্রী। পরে তাঁর বাবা-মা তাঁকে নিতে এলে গাড়িতে করে স্টুডিও থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তনুশ্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় একদল লোক তাঁর গাড়ি ঘিরে হামলা চালায় এবং ভাঙচুর করে। ওই হামলাকারীদের সঙ্গে নানার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ২০০৮ সালে পুলিশের কাছে করা অভিযোগে গাড়ি ভাঙচুরের বিষয়টি নথিভুক্ত হয়েছিল; যৌন হেনস্থার অভিযোগ সেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
২০১৮ সালে অভিযোগ, ফের গতি পায় ‘মি টু’ আন্দোলন
ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তনুশ্রী আবারও বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ঘটনাটি সম্পর্কে অনেকে জানলেও কেউ প্রতিবাদ করেননি। অভিযোগটি সামনে আসার পর ভারতে কর্মক্ষেত্র ও বিনোদনজগতে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নতুন করে জোরালো হয়। সেই সময় ‘হ্যাশট্যাগ মি টু’ আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রের নারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করেন।
নানা পাটেকর শুরু থেকেই তনুশ্রীর অভিযোগ অস্বীকার করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যৌন হেনস্থা বলতে কী বোঝাচ্ছেন? সেখানে পঞ্চাশ থেকে একশো জন মানুষ ছিল।’
পরে নানার আইনজীবী তনুশ্রীকে আইনি নোটিস পাঠিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।
২০১৮ সালের অক্টোবরে তনুশ্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে মুম্বাইয়ের ওশিওয়ারা থানায় মামলা হয়। এতে নানা পাটেকরের পাশাপাশি কোরিওগ্রাফার গণেশ আচার্যের নামও ছিল। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪ ও ৫০৯ ধারায় মামলাটি করা হয়েছিল।
তদন্তে পর্যাপ্ত প্রমাণ পায়নি পুলিশ, সময়সীমার কারণে মামলা নিষ্পত্তি
২০১৯ সালে মুম্বাই পুলিশ জানায়, অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের এই অবস্থানের সঙ্গে একমত হননি তনুশ্রী।
এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের মার্চে মুম্বাইয়ের আন্ধেরির একটি আদালত মামলাটি নিষ্পত্তি করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, ২০০৮ সালের ঘটনার প্রায় এক দশক পর দায়ের করা মামলাটি আইন নির্ধারিত সময়সীমার বাইরে ছিল। ফলে অভিযোগের মূল সত্যতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর্যায়ে যায়নি আদালত।
অর্থাৎ, আদালতের এই সিদ্ধান্তকে নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া কিংবা তনুশ্রীর অভিযোগ সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। পুলিশ তদন্তে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানিয়েছিল, আর আদালত সময়সীমার কারণে মামলাটি নিষ্পত্তি করে।
নানা পাটেকরের মৃত্যুর পর তাঁর অভিনয়জীবন ও চলচ্চিত্রে অবদান নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন সহকর্মী ও ভক্তরা। একই সঙ্গে পুরোনো এই অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে অভিযোগ, পুলিশের তদন্ত এবং আদালতের সিদ্ধান্ত—প্রতিটি বিষয়কে আলাদা করে দেখাই এ ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।