
একসময় পৃথিবীতে টিকে ছিল মাত্র পাঁচটি। বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্ত থেকে দীর্ঘ সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় ফিরে আসা সেই বিরল কালো রবিনই এবার নিউজিল্যান্ডের ‘বার্ড অব দ্য ইয়ার ২০২৬’ নির্বাচিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘কারুরে’ নামে পরিচিত পাখিটি পেয়েছে ২৫ হাজারের বেশি ভোট।
চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জের স্থানীয় এই ছোট আকারের কালো পাখিটি প্রতিযোগিতায় পেছনে ফেলেছে বিশালাকৃতির উড্ডয়নহীন তোতা ‘কাকাপো’ এবং নিউজিল্যান্ডের বাজপাখি ‘কারেআরেআ’কে। কাকাপো হয়েছে দ্বিতীয় এবং কারেআরেআ তৃতীয়।
নিউজিল্যান্ডের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পূর্বে চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জে কারুরের আবাস। একসময় প্রজাতিটির অস্তিত্ব প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ১৯৮০ সালে বিশ্বে জীবিত ছিল মাত্র পাঁচটি কালো রবিন। তাদের মধ্যে প্রজননে সক্ষম স্ত্রী পাখি ছিল মাত্র একটি—‘ওল্ড ব্লু’ নামে পরিচিত সেই পাখিটিকে ঘিরেই শুরু হয় জরুরি সংরক্ষণ ও প্রজনন কর্মসূচি। তার সঙ্গে ছিল পুরুষ পাখি ‘ওল্ড ইয়েলো’।
দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বর্তমানে শিকারিমুক্ত দুটি সংরক্ষিত দ্বীপে প্রায় ৩৫০টি প্রাপ্তবয়স্ক কালো রবিন রয়েছে। তবে নিউজিল্যান্ডের সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ এখনো প্রজাতিটিকে জাতীয়ভাবে সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচনা করে।
সংরক্ষণকর্মীদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। বর্তমানে যে দুটি দ্বীপে কারুরের বসবাস, সেখানে আবাসস্থল প্রায় পূর্ণ হয়ে এসেছে। ফলে প্রজাতিটির সংখ্যা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ রাখতে তৃতীয় একটি সুরক্ষিত দ্বীপে তাদের বসতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
এবারের ‘বার্ড অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় ভোট পড়েছে রেকর্ডসংখ্যক। আয়োজক সংস্থা ফরেস্ট অ্যান্ড বার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১ লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন। দেশটির প্রতি ৫০ জনের মধ্যে অন্তত একজন এতে অংশ নিয়েছেন। গত বছর ভোট পড়েছিল প্রায় ৭৫ হাজার, আর প্রতিযোগিতার প্রথম আয়োজনে ভোটার ছিল মাত্র ৯০০ জন।
এবারের ভোটের প্রায় ৮৮ শতাংশই এসেছে নিউজিল্যান্ডের বাসিন্দাদের কাছ থেকে। বিপন্ন পাখি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়ানোই প্রতিযোগিতাটির মূল উদ্দেশ্য হলেও সময়ের সঙ্গে এটি দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয় একটি আয়োজন হয়ে উঠেছে। প্রতিযোগিতাকে ঘিরে মিম, হাস্যরস এমনকি ভোট জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেছে।
২০২০ সালে একটি আইপি ঠিকানা থেকে এক হাজারের বেশি ভুয়া ই-মেইল ব্যবহার করে ভোটে কারচুপির চেষ্টা হয়েছিল। আর ২০২১ সালে পাখিদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়েছিল নিউজিল্যান্ডের একটি বাদুড়।
চলতি বছরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া পাখিদের বিভিন্ন মজার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল। এই হাস্যরসাত্মক আয়োজনের আড়ালে অবশ্য রয়েছে গুরুতর একটি বার্তা। আয়োজকদের হিসাবে, নিউজিল্যান্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ দেশীয় পাখিই কোনো না কোনোভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এবারের সেরা দশে থাকা আটটি প্রজাতিও সেই ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে।
কারুরের এবারের জয় তাই শুধু একটি জনপ্রিয় প্রতিযোগিতায় সাফল্য নয়; বিলুপ্তির দ্বার থেকে ফিরে আসা একটি প্রজাতির সংরক্ষণযাত্রাকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
সূত্র: সিএনএন