
লিভারের দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির হঠাৎ রক্তবমি হলে বিষয়টিকে কখনোই সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিশেষ করে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে খাদ্যনালির প্রসারিত রক্তনালি ফেটে গিয়ে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে অল্প সময়ের মধ্যে রক্তচাপ কমে যাওয়া, শক এবং জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অনেক সময় রোগীর স্বজনেরা প্রথমে বুঝতে পারেন না, কেন এমন রক্তক্ষরণ হচ্ছে বা কীভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে সচেতনতা জরুরি, কারণ সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো এবং যথাযথ চিকিৎসা রোগীর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লিভারের রোগে খাদ্যনালির রক্তনালি কেন ফুলে যায়?
লিভার সিরোসিস হলে লিভারের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে লিভারের ভেতর দিয়ে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে এবং পোর্টাল শিরায় রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে ‘পোর্টাল হাইপারটেনশন’ বলা হয়।
এই বাড়তি চাপের কারণে খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর আশপাশের কিছু রক্তনালি ফুলে ওঠে। খাদ্যনালির এ ধরনের প্রসারিত রক্তনালিকে ‘ইসোফেজিয়াল ভ্যারিসেস’ বলা হয়। রক্তনালিগুলোর দেয়াল তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় এগুলো ফেটে গুরুতর রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে।
তবে সব লিভার রোগীর এমন সমস্যা হয় না। আবার রক্তবমির কারণ সব সময় খাদ্যনালির রক্তনালি ফেটে যাওয়াও নয়। পাকস্থলীর আলসারসহ পরিপাকতন্ত্রের অন্যান্য সমস্যার কারণেও রক্তপাত হতে পারে। তাই সঠিক কারণ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত?
খাদ্যনালির প্রসারিত রক্তনালি ফেটে গেলে হঠাৎ প্রচুর টাটকা লাল রক্তবমি হতে পারে। কখনো গাঢ় রঙের বা কফির গুঁড়ার মতো পদার্থও বমির সঙ্গে বের হতে পারে। রক্তক্ষরণের কারণে পায়খানা কালো ও আলকাতরার মতো আঠালো হতে পারে।
বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে যদি রোগীর মধ্যে দেখা যায়:
• হঠাৎ রক্তবমি বা বমির সঙ্গে রক্তের জমাট অংশ বের হওয়া।
• কালো, আঠালো পায়খানা।
• মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা ঠান্ডা ঘাম।
• দ্রুত হৃদস্পন্দন, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট।
• অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা চেতনা কমে যাওয়া।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা করা বিপজ্জনক। রোগীর রক্তচাপ স্বাভাবিক মনে হলেও গুরুতর রক্তক্ষরণ চলতে পারে। তাই দ্রুত জরুরি বিভাগে নেওয়া প্রয়োজন।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কী চিকিৎসা দেওয়া হয়?
এ ধরনের রক্তক্ষরণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হাসপাতালে প্রথমে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস, রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন ও রক্তক্ষরণের তীব্রতা মূল্যায়ন করা হয়। প্রয়োজনে শিরায় তরল, রক্ত সঞ্চালন এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
রক্তক্ষরণের সম্ভাব্য উৎস শনাক্ত করতে সাধারণত জরুরি এন্ডোস্কোপির প্রয়োজন হয়। এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর ভেতর পরীক্ষা করে রক্তপাতের উৎস নির্ণয় করা যায়। খাদ্যনালির প্রসারিত রক্তনালি থেকে রক্তক্ষরণ হলে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে রক্তনালির ওপর ব্যান্ড লাগিয়ে রক্তপাত বন্ধ করা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়।
চিকিৎসকেরা পরিস্থিতি অনুযায়ী রক্তক্ষরণ কমানোর ওষুধ এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে না এলে বা পুনরায় রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি থাকলে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের চিকিৎসা, যেমন টিআইপিএস (TIPS), বিবেচনা করা হতে পারে।
কোন চিকিৎসা প্রয়োজন, তা নির্ভর করে রোগীর শারীরিক অবস্থা, লিভারের কার্যক্ষমতা এবং রক্তক্ষরণের তীব্রতার ওপর।
রক্তক্ষরণ বন্ধ হলেই কি ঝুঁকি শেষ?
না। রক্তক্ষরণ বন্ধ হওয়ার পরও পুনরায় রক্তপাতের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা, লিভারের রোগের তীব্রতা মূল্যায়ন করা এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ওষুধ, পুনরায় এন্ডোস্কোপি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য চিকিৎসা নিতে হতে পারে। লিভারের রোগের কারণ শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও জরুরি।
রোগীর স্বজনদের উচিত চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা, নির্ধারিত ফলোআপ বজায় রাখা এবং নতুন কোনো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করা।
রোগীর স্বজনদের করণীয় কী?
রক্তবমি হলে রোগীকে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রচুর রক্তপাত, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার লক্ষণ থাকলে অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি সহায়তা নেওয়া উচিত।
রোগীকে নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ানো বা ঘরোয়া চিকিৎসা করার চেষ্টা করবেন না। বিশেষ করে রোগীর চেতনা কমে গেলে বা বমি চলতে থাকলে মুখে খাবার, পানি কিংবা ওষুধ দেবেন না—এতে শ্বাসনালিতে পদার্থ ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। জরুরি চিকিৎসাকর্মীর নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
রোগী আগে থেকে লিভারের রোগে আক্রান্ত হলে তাঁর চিকিৎসার নথি এবং নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধের তথ্য সঙ্গে নেওয়া সহায়ক হতে পারে। তবে এসব সংগ্রহ করতে গিয়ে হাসপাতালে যাওয়া বিলম্বিত করা যাবে না।
সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তবমি একটি গুরুতর বিপৎসংকেত। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো, রক্তক্ষরণের উৎস শনাক্ত করা এবং যথাযথ চিকিৎসা শুরু করা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি রক্তপাত বন্ধ হওয়ার পরও নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জটিলতার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা জরুরি।
মনে রাখবেন: লিভারের রোগীর রক্তবমি হলে এক মুহূর্তও অবহেলা করবেন না। এটি প্রাণঘাতী অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের লক্ষণ হতে পারে—অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন।
ডা. এস. এম. সোহেল রানা
এটেন্ডিং কনসালট্যান্ট - গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি এন্ড হেপাটোলজি
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম