
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টাকে ব্যক্তিগত আলোচনায় তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ খোঁজা প্রয়োজন। শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে তাঁর।
শনিবার (৮ আগস্ট) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্রের বরাতে এসব তথ্য জানিয়েছে।
একটি সূত্রের ভাষায়, 'কেইন সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন।' সূত্রগুলো জানায়, সংঘাত আরও সামরিকভাবে বাড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে নিজেও উদ্বিগ্ন কেইন। এ বিষয়ে তিনি সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
সম্প্রতি এসব কর্মকর্তার সঙ্গে কেইনের একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা। পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের আগে ইরান ইস্যুতে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি নিয়ে কর্মকর্তাদের একই অবস্থানে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই আগ্রহ দেখাননি। তাঁর ধারণা, ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে তেহরানকে তাঁর শর্ত অনুযায়ী একটি চুক্তিতে রাজি করানো সম্ভব। তবে কেইনসহ প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে মনে করছেন, কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।
এ কারণে ট্রাম্পের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই বিকল্প সামরিক ও কূটনৈতিক পথ খোঁজা হচ্ছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউস অবশ্য জেনারেল কেইনের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। সিএনএনকে দেওয়া এক বক্তব্যে এক কর্মকর্তা তাঁকে প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা দলের 'অসাধারণ সম্পদ' হিসেবে উল্লেখ করেন। সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানের সাফল্যকে কেইনের ভূমিকার প্রমাণ হিসেবেও তুলে ধরেন তিনি।
তবে ইরানে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে কেইনের নিজস্ব মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে সতর্ক। গত মাসের শেষ দিকে কংগ্রেসের এক শুনানিতে তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, 'বিমান শক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।'
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অনেকেই সামরিক বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা মূল্যায়নের ভিত্তিতে একই ধরনের অবস্থানে পৌঁছেছেন বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতেই জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরানে আরও বড় ও আগ্রাসী হামলা চালানোর একটি পরিকল্পনা নিয়ে কেইন ও প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, নতুন করে ব্যাপক হামলা শুরু হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
শুরুতে ট্রাম্প ওই 'ব্যাপক' সামরিক অভিযানে সম্মতি দেওয়ার দিকে এগোলেও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে সরে আসেন। তবে ভবিষ্যতে ওই হামলার পরিকল্পনা আবারও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে বলে প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে।
এ সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া অস্ত্রের মজুতও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কাজ করেছে। সিএনএনের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, এ ধরনের হামলা ইরানের জনগণকে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে।
ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে হামলার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে।
সামরিক পরিকল্পনার সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও জেনারেল কেইন বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। এমনকি নিয়মিত প্রেসিডেন্টকে ব্রিফ করা এবং নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে একপর্যায়ে হোয়াইট হাউসে একটি অফিস পাওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন।
গত মাসের শেষ দিকে ট্রাম্প ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি বৈঠকেও কেইন ইরানে আরও হামলার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া অস্ত্রের মজুতের বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন।
একই বৈঠকে তিনি প্রেসিডেন্টকে জানান, ট্রাম্প সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম।
তবে ব্যক্তিগত আলোচনায় কেইন আরও সরাসরি তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান পর্যায়ে কেবল বিমান হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা কম।
একটি সূত্রের ভাষ্য, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার সময় কেইন সবসময় নিজের অবস্থান অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রকাশ করেন না। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে তিনি আগের তুলনায় বেশি সরব হয়েছেন।