
ইন্টারপোলের রেড নোটিশের জালে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মোট ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ বর্তমানে আদালতে চলমান থাকলেও বাকি পাঁচটি মামলার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। দুদকের প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মামলার অগ্রগতি নিয়ে তিনি জানান, বর্তমানে যে মামলাটির বিচার চলছে, সেটি এখন সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে এবং ইতিমধ্যে ৫ জন সাক্ষী আদালতে তাদের জবানবন্দি দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন বেনজীর আহমেদ। গত ১২ জুন আমিরাত কর্তৃপক্ষ ই-মেইলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে তাঁর এই গ্রেপ্তারের খবরটি জানায়। এর আগে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরুর পর, ২০২৪ সালের ৪ মে সপরিবারে দেশ ছেড়েছিলেন সাবেক এই পুলিশপ্রধান।
দুদকের করা এই ছয়টি মামলার আইনি বিন্যাস বেশ সুনির্দিষ্ট। এর মধ্যে তিনটি মামলায় প্রধান অভিযুক্ত স্বয়ং বেনজীর আহমেদ। আর বাকি তিনটি মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে যথাক্রমে তাঁর স্ত্রী জীশান মির্জা, বড় মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর এবং মেজ মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরকে। এই তিন মামলায় বেনজীর আহমেদকে সহযোগী আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চলমান অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা
বেনজীর আহমেদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মূল মামলাটির বিচারকার্য চলছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এ। এই মামলায় মামলার বাদীসহ মোট পাঁচজন সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া শেষ হয়েছে। আগামী ২৩ জুন মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেছেন আদালত। এই মামলায় দুদকের পক্ষে মোট ৩৮ জন সাক্ষী রয়েছেন।
গত বছরের ৩০ নভেম্বর এই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয় দুদক। এরপর গত ৮ মার্চ আদালত সেই অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। তিনি আদালতে হাজির না হওয়ায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই (পলাতক দেখিয়ে) মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। দুদকের চার্জশিট অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ অবৈধ উপায়ে ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন।
মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হওয়ার আশা প্রকাশ করে দুদকের প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম বলেন,
"বেনজীর আহমেদকে যদি দেশে ফিরিয়ে আনা হয়, তিনি যদি এসে মামলা লড়েন, তাহলে সাক্ষীদের আবার জেরা হবে। তারপর বিচারিক প্রক্রিয়া এগোবে পর্যায়ক্রমে।"
জালিয়াতি ও জাজ্বল্যমান জালিয়াতি: পাসপোর্ট মামলা
সরকারি স্পর্শকাতর পদে আসীন থেকে নিজেকে বেসরকারি চাকুরিজীবী বা ‘প্রাইভেট সার্ভিসহোল্ডার’ পরিচয় দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট তোলার অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বেনজীরসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
এই মামলায় অন্য চার আসামি হলেন—ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের সাবেক পরিচালক মো. ফজলুল হক, সাবেক পরিচালক মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের কারিগরি ব্যবস্থাপক সাহেনা হক।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, র্যাবের মহাপরিচালক ও ডিএমপি কমিশনারের মতো রাষ্ট্রের চরম গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে থাকাকালীন বেনজীর আহমেদ বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়াই একাধিকবার এমআরপি ও ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। পাসপোর্ট অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই জালিয়াতির বিষয় অবগত থাকার পরও প্রভাব খাটিয়ে তা অনুমোদন দেন।
কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী ও দুই কন্যার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অর্থপাচারের (মানি লন্ডারিং) সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আরেকটি মামলা করে দুদক, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, বেনজীর আহমেদ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নগদ ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা তোলার পর তা দেশের কোথাও বিনিয়োগ করেননি। বিপুল পরিমাণ এই অর্থ তোলার পরপরই তিনি দেশত্যাগ করেন। দুদকের অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ২০২৪ সালের বিভিন্ন সময়ে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা নিজেদের নামে থাকা একাধিক এফডিআর (স্থায়ী আমানত) মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ভেঙে নগদ টাকা তুলে নেন, যার কোনো বৈধ উৎস তাঁরা দেখাতে পারেননি।
স্ত্রী ও দুই কন্যার নামে যত মামলা
বিগত ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বেনজীরের স্ত্রী জীশান মির্জা ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা করে দুদক। তিনটিতেই বেনজীরকে সহযোগী আসামি করা হয়।
স্ত্রী জীশান মির্জা: তাঁর বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ ৫৫ Lever ১৪৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ ৭১ হাজার ৩৩৬ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে।
বড় মেয়ে ফারহিন রিশতা: তাঁর বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৭৫ লাখ ২৭৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মেজ মেয়ে তাহসিন রাইসা: তাঁর বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছে দুদক।
সার্বিক বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বন্দি সাবেক এই আইজিপিকে দ্রুত দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুরোদমে চলছে।