
উজানের ভারী বৃষ্টি ও মৌসুমি আবহাওয়ার প্রভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সোমবারের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। একই সময়ে সিলেট অঞ্চলের কয়েকটি নদী ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এদিকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের বৈরী আবহাওয়ার কারণে চার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) সর্বশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, ভারতের উজানে ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি দ্রুত বাড়ছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে এসব নদীর পানি কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
এর ফলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি বাড়লেও তা এখনও বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। আগামী পাঁচ দিনে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদ-নদীর পানিও বাড়তে পারে, যদিও সেগুলো বিপৎসীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা নেই।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, জেলার কোনো নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে আসামে ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানি আরও বাড়তে পারে। তার মতে, কিছু নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকলেও বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা কম।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, জেলার সব নদীর পানিই বাড়ছে। তিস্তার পানি কোথাও কোথাও বিপৎসীমা ছাড়াতে পারে এবং আগামী দুই থেকে তিন দিনে নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামও জানিয়েছেন, উজানের বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি রংপুর ও কুড়িগ্রামে আরও বাড়বে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যার ঝুঁকি তৈরি হলেও এখনো নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।
এদিকে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় পরিস্থিতিরও অবনতি হচ্ছে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছাতকে সুরমা এবং মৌলভীবাজারের শেরপুরে কুশিয়ারার পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। আগামী তিন দিনে এসব নদীর পানি আরও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানিও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। অন্যদিকে নওগাঁর কয়েকটি পয়েন্টে আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর পানি এখনও সতর্কসীমায় রয়েছে। জামালপুর ও বগুড়ার কিছু এলাকায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
বরিশাল বিভাগেও টানা চার দিনের অস্বাভাবিক জোয়ারে একাধিক নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কীর্তনখোলা, তেঁতুলিয়া, মেঘনা, বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে বিভিন্ন লঞ্চ ও ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে ও পন্টুন, ফলে যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে ওঠানামা করতে হচ্ছে।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম বলেন, একসঙ্গে এতগুলো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার ঘটনা এবারই প্রথম দেখা গেল।
অন্যদিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি স্পিলওয়ে গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানিয়েছে, গেট দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট দিয়ে আরও ৩২ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে ছাড়া হচ্ছে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, পানি ছাড়ার আগে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা ছিল ১০৪ দশমিক ০৯ ফুট (এমএসএল), যেখানে বিপৎসীমা ধরা হয় ১০৮ ফুট।
এদিকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্য বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পাশাপাশি উত্তর বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রেডফ্ল্যাগ শব্দ: নেই