
ম্যাচের শুরুতে পেনাল্টি মিস। আর্জেন্টিনা তখন বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। স্কোরবোর্ডে দুই গোলের ঘাটতি, গ্যালারিতে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাদুকরদের একজনের গল্প কি এত সহজে শেষ হয়? হয় না। আটলান্টার সেই রাতেই লিওনেল মেসি আবারও লিখলেন এমন এক অধ্যায়, যেখানে জয়, প্রত্যাবর্তন আর ইতিহাস একাকার হয়ে গেল।
মিসরের বিপক্ষে ৩–২ গোলের অবিশ্বাস্য জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। আর এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে থেকে একসঙ্গে একাধিক রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন অধিনায়ক মেসি। সবচেয়ে বড় কীর্তি, বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতার নতুন রেকর্ড এখন তার দখলে।
ম্যাচের ৭৯তম মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর গোলে সহায়তা করেন মেসি। সেই অ্যাসিস্টই তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্বকাপে মোট ৯টি অ্যাসিস্টের মাইলফলকে। এর মধ্য দিয়ে ভেঙে যায় আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার ৮ অ্যাসিস্টের দীর্ঘদিনের রেকর্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন সবচেয়ে বেশি গোলে সহায়তা করা ফুটবলারের নাম লিওনেল মেসি।
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের তালিকায় এখন সবার ওপরে মেসি। তার পরে রয়েছেন ম্যারাডোনা। যৌথভাবে তৃতীয় স্থানে আছেন জার্মানির পিয়েরে লিটবারস্কি ও পোল্যান্ডের গ্রজেগর্জ লাতো।
তবে ইতিহাসের খাতা বদলানো সেখানেই থেমে থাকেনি।
মিসরের বিপক্ষে সমতা ফেরানো গোলটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে মেসির অষ্টম গোল। এর মাধ্যমে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে গিয়ের্মো স্তাবিলের গড়া এক আসরে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ আট গোলের রেকর্ডে ভাগ বসান তিনি। প্রায় ৯৬ বছর ধরে অক্ষত থাকা সেই কীর্তির পাশে এবার লেখা হলো আরেকটি নাম - লিওনেল মেসি।
আরও একটি অনন্য রেকর্ড গড়েছেন আটবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই তারকা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে নকআউট পর্বে টানা ছয় ম্যাচে গোল করার কীর্তি এখন তার একার। বড় মঞ্চে, সবচেয়ে কঠিন সময়ে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার আরেকটি উজ্জ্বল প্রমাণ হয়ে রইল এই অর্জন।
এছাড়া বিশ্বকাপে টানা নয় ম্যাচে গোল করার বিরল কৃতিত্বও এখন মেসির দখলে। ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে এত দীর্ঘ গোলধারার নজির আর কোনো ফুটবলারের নেই।
সব অর্জনের মাঝেও অবশ্য একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডও যোগ হয়েছে তার নামের পাশে। মিসরের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করায় এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ দুটি পেনাল্টি মিসের রেকর্ডেও নাম লিখিয়েছেন তিনি। তবে সেই হতাশাকে মুহূর্তেই আড়াল করে দেন নিজের গোল, অ্যাসিস্ট এবং নেতৃত্বে।
একই ম্যাচে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সর্বোচ্চ ১৪ ম্যাচ খেলার নতুন রেকর্ডও গড়েছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট:
১. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) - ৯টি
২. দিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা) - ৮টি
৩. পিয়েরে লিটবারস্কি (জার্মানি) - ৭টি
৪. গ্রজেগর্জ লাতো (পোল্যান্ড) - ৭টি
পেনাল্টি মিস দিয়ে শুরু হওয়া রাতটি শেষ হয়েছে রেকর্ড, প্রত্যাবর্তন আর বিজয়ের উল্লাসে। তাই আটলান্টার এই রাত শুধু আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার গল্প নয়, এটি এমন এক কিংবদন্তির গল্প, যিনি প্রতিবারই মনে করিয়ে দেন - রেকর্ড ভাঙার জন্যই যেন তার জন্ম।