
২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট কেটেছে আর্জেন্টিনা। তবে মাঠের এই নান্দনিক জয়ের আনন্দ উৎসব ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বইছে তীব্র বিতর্কের ঝড়। ম্যাচ শেষে মাঠের উদযাপনে আলবিসেলেস্তে শিবিরের কয়েকজন ফুটবলারের ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’ লেখা একটি রাজনৈতিক ব্যানার প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে যুক্তরাজ্যের রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহল।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সাবেক উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক নাইল গার্ডিনার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি পুরো ঘটনাটিকে ‘ব্রিটিশবিরোধী প্রদর্শন’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং ব্যানার প্রদর্শনে জড়িত আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো দাবি জানান।
ইপিলএলে খেলা তারকাদের ভিসা বাতিলের দাবি
আর্জেন্টিনার শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘লা নাসিওন’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, নাইল গার্ডিনারের মূল লক্ষ্য ছিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে (ইপিএল) খেলা আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা। তিনি সাফ দাবি করেন, যেসব খেলোয়াড় ওই ব্যানারটি তুলে ধরেছেন, যুক্তরাজ্যে তাদের কাজের অনুমতি বা কর্মভিসা অনতিবিলম্বে বাতিল করা দরকার।
এক্সে দেওয়া একটি পোস্টে গার্ডিনার লিখেছেন:
"ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা যেসব আর্জেন্টাইন ফুটবলার এই ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে, তাদের কর্মভিসা বাতিল করা উচিত।"
এর পাশাপাশি ফুটবল মাঠের ভেতর যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রচারণা বা বার্তা দেওয়ার বিরুদ্ধে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফাকে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। লাইভ সম্প্রচার চলাকালীন ব্যানারটি হাতে নিয়ে উল্লাস করতে দেখা যাওয়ায় টটেনহ্যাম হটস্পারের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় ক্রিস্তিয়ান রোমেরো এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে আসে।
গার্ডিনার শুধু ফুটবলারদের শাস্তি দিয়েই ক্ষান্ত হতে চান না, বরং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)-এর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছেন। তাঁর মতে, সবুজ মাঠে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যানার বহন করা সরাসরি ফিফার নীতিমালার পরিপন্থী।
সমালোচনায় অবিচল আলবিসেলেস্তেরা
গার্ডিনারের এই মারমুখী মন্তব্য মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনামে পরিণত হয়। ‘ইনফোবায়ে’ এবং ‘ইএসপিএন’-এর বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘটনাটি ক্রীড়াঙ্গনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বিবৃতির সীমারেখা নিয়ে নতুন এক তর্কের জন্ম দিয়েছে।
তবে ব্রিটিশদের এই কড়া সমালোচনায় একদমই কান দিচ্ছেন না আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, প্রদর্শিত ব্যানারটি কোনো বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ছিল না, বরং তা ছিল দেশের জাতীয় আবেগ ও ঐতিহাসিক ভৌগোলিক অবস্থানের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ।
বিতর্কের জবাবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা লিসান্দ্রো মার্তিনেজ বলেন:
"আমরা সব সময় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করি। আর্জেন্টিনার মানুষকে হতাশ করতে চাইনি।"
একই সুরে কথা বলেছেন তারকা মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসও। তিনি বলেন:
"ফকল্যান্ড আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক অধ্যায়। আমরা দেশের মানুষের অনুভূতিকে সম্মান জানিয়েই খেলেছি।"
পুরনো দ্বন্দ্বের নতুন মঞ্চ
নাইল গার্ডিনারের সাথে আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিদের এই ভূরাজনৈতিক দ্বৈরথ নতুন কিছু নয়। এর আগেও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের (যা আর্জেন্টাইনদের কাছে মালভিনাস নামে পরিচিত) মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে আর্জেন্টিনার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে তাঁর সরাসরি বিতর্ক হয়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই আর্জেন্টিনার অর্থসচিব ও উপ-অর্থমন্ত্রী পাবলো কির্নোর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ফকল্যান্ড ইস্যুতে এক দফা ভার্চুয়াল বাকযুদ্ধে জড়িয়েছিলেন গার্ডিনার।
বাইরের আকাশ যতই মেঘাচ্ছন্ন হোক না কেন, রাজনৈতিক এই তর্ক-বিতর্ক দূরে ঠেলে আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়দের সমস্ত মনোযোগ এখন শুধুই বিশ্বকাপ ফাইনালের দিকে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি ঘরে তুলে নিজেদের জার্সিতে বিশ্বজয়ের আরেকটি সোনালী তারকা যোগ করতেই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সারছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।