
বিমানবন্দর, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, শপিং মল কিংবা কোনো লাউঞ্জে অপেক্ষার সময় বিনা মূল্যের ওয়াই-ফাই দেখলেই অনেকেই দ্রুত সেটিতে যুক্ত হয়ে যান। এতে মোবাইল ডেটা খরচ না করেই ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। তবে এমন কোনো নেটওয়ার্কে সংযোগ দেওয়ার আগে ভাবা দরকার—এই সুবিধা নিতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত তথ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন কি না।
পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করলেই বিপদ হবে—বিষয়টি এমন নয়। বর্তমানে পরিচিত অধিকাংশ ওয়েবসাইট এইচটিটিপিএস এনক্রিপশন ব্যবহার করে। ফলে আগের তুলনায় এ ধরনের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। তারপরও নকল ওয়াই-ফাই, ভুয়া ওয়েবসাইট কিংবা দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য এখনো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) জানিয়েছে, আধুনিক এনক্রিপশন ব্যবস্থার কারণে পাবলিক ওয়াই-ফাই আগের তুলনায় সাধারণত নিরাপদ। তবে ব্যবহারকারীদের সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
কোন তথ্যগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করার সময় বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
ইমেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের লগইন তথ্য
বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড
ব্যাংকিং ও ব্যাংক কার্ডের তথ্য
ব্যক্তিগত বার্তা ও গুরুত্বপূর্ণ নথি
অন্যান্য অ্যাকাউন্টের সংবেদনশীল তথ্য
বিশেষ করে এনক্রিপশন নেই এমন ওয়েবসাইট কিংবা সন্দেহজনক কোনো নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে অন্য কেউ সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আদান-প্রদান হওয়া তথ্য পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করতে পারে।
পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, পাসওয়ার্ড কিংবা কার্ডের তথ্য ব্যবহারের সময় বাড়তি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবারসিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সি (সিআইএসএ)।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে নকল ওয়াই-ফাই
পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ফাঁদগুলোর একটি হলো নকল নেটওয়ার্ক।
ধরা যাক, কোনো কফিশপের আসল ওয়াই-ফাইয়ের নাম ‘কফিহাউজ_গেস্ট’। সেখানে বসে কোনো প্রতারক একই ধরনের আরেকটি হটস্পট চালু করল ‘কফিহাউজ_ফ্রি_ওয়াইফাই’ নামে। নাম দেখে ব্যবহারকারী সেটিকেই কফিশপের আসল নেটওয়ার্ক মনে করে সংযুক্ত হয়ে যেতে পারেন।
এ ধরনের ভুয়া হটস্পটকে অনেক সময় ‘ইভিল টুইন’ বলা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আসল নেটওয়ার্কের মতো নাম ব্যবহার করে ব্যবহারকারীকে প্রতারকের তৈরি নেটওয়ার্কে নিয়ে আসা।
আপনি যদি ভুল করে ওই নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হন, তাহলে প্রতারক আপনার ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
তাই বিমানবন্দর, হোটেল কিংবা রেস্টুরেন্টে কোনো ফ্রি বা পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারের আগে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছ থেকে নেটওয়ার্কের সঠিক নাম জেনে নেওয়া নিরাপদ।
পাসওয়ার্ড থাকলেই নিরাপদ নয়
কোনো ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে পাসওয়ার্ড দেওয়া আছে বলেই সেটিকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
অনেক রেস্টুরেন্টে দেয়ালে একটি পাসওয়ার্ড লিখে রাখা থাকে এবং সেই একই পাসওয়ার্ড দিয়ে শত শত মানুষ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেন। তাই শুধু পাসওয়ার্ড থাকার বিষয়টি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না।
আর যে ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে কোনো পাসওয়ার্ড ছাড়াই সরাসরি প্রবেশ করা যায়, সেগুলোর ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, নিজের বাসার ওয়াই-ফাইয়ের ক্ষেত্রে ডব্লিউপিএ২ বা ডব্লিউপিএ৩ এনক্রিপশন ব্যবহার করা নিরাপদ। এফটিসি ডব্লিউপিএ৩-কে নতুন ও শক্তিশালী এনক্রিপশন মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ওয়েবসাইটে এইচটিটিপিএস আছে কি না দেখুন
পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে কোনো ওয়েবসাইটে প্রবেশের আগে ব্রাউজারের অ্যাড্রেস বারে ‘https://’ রয়েছে কি না এবং লক চিহ্ন দেখা যাচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা উচিত।
এইচটিটিপিএস সক্রিয় থাকলে আপনার ডিভাইস ও ওয়েবসাইটের মধ্যে আদান-প্রদান করা তথ্য এনক্রিপটেড থাকে। ফলে একই ওয়াই-ফাই ব্যবহারকারী অন্য কারও পক্ষে সেই তথ্য সরাসরি পড়ে ফেলা অনেক কঠিন হয়ে যায়।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—এইচটিটিপিএস থাকলেই কোনো ওয়েবসাইটকে বিশ্বাসযোগ্য ধরে নেওয়া যাবে না।
প্রতারকের তৈরি ভুয়া ওয়েবসাইটেও এইচটিটিপিএস থাকতে পারে। এ বিষয়ে এফটিসি সতর্ক করেছে যে স্ক্যামাররাও এনক্রিপটেড ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে। ফলে সংযোগটি এনক্রিপটেড হলেও আপনি যে তথ্য দিচ্ছেন, তা সরাসরি প্রতারকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
সুতরাং শুধু লক চিহ্ন দেখলেই হবে না; ওয়েবসাইটের ডোমেইন নামটিও সঠিক কি না যাচাই করতে হবে।
ব্যাংকিংয়ে পাবলিক ওয়াই-ফাই এড়িয়ে চলুন
পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা বা সংবাদ পড়ার বিষয়টি আর ব্যাংকিং করার বিষয়টি এক নয়।
ব্যাংকিং অ্যাপ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) কিংবা কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় সম্ভব হলে ওয়াই-ফাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নিজের মোবাইল ডেটা ব্যবহার করা ভালো।
বিশেষ করে অপরিচিত ও উন্মুক্ত কোনো ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকা অবস্থায় ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেন না করাই নিরাপদ।
অটো-কানেক্ট বন্ধ রাখুন
ফোনে ওয়াই-ফাইয়ের অটো-কানেক্ট সুবিধা চালু থাকলে আগে ব্যবহৃত কোনো নেটওয়ার্কের নাম আবার সামনে এলেই ডিভাইস স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেখানে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
সুবিধাজনক হলেও জনসমাগমের জায়গায় এই বৈশিষ্ট্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাই প্রয়োজন নেই এমন ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে অটো-কানেক্ট বা অটো-জয়েন সুবিধা বন্ধ রাখা উচিত। ব্যবহার শেষ হলে নেটওয়ার্কটি ডিভাইস থেকে মুছে বা ‘ফরগেট’ করে দেওয়াও ভালো।
পাবলিক ওয়াই-ফাইয়ের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় সংযোগ বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে সিআইএসএ।
ভিপিএন কি সব ঝুঁকি দূর করতে পারে?
বিশ্বস্ত ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন ব্যবহার করলে ডিভাইস ও ভিপিএন সার্ভারের মধ্যে চলাচল করা তথ্য এনক্রিপটেড থাকে। ফলে পাবলিক ওয়াই-ফাইয়ের স্থানীয় নেটওয়ার্ক থেকে সেই ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ করা আরও কঠিন হয়।
সংবেদনশীল কাজ করার ক্ষেত্রে পাবলিক ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক বা ওয়াই-ফাই ব্যবহার করলে ভিপিএন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সিআইএসএ।
তবে ভিপিএনকে কোনো ধরনের জাদুকরী সুরক্ষা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
উদাহরণ হিসেবে, ভিপিএন চালু থাকা অবস্থাতেও আপনি যদি কোনো ভুয়া ব্যাংকিং ওয়েবসাইটে নিজের পাসওয়ার্ড দিয়ে দেন, তাহলে সেই প্রতারণা থেকে ভিপিএন আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না।
তাই ভিপিএন ব্যবহারের পাশাপাশি যে ওয়েবসাইট বা সেবা ব্যবহার করছেন, সেটি আসল কি না তা যাচাই করাও জরুরি।
ফ্রি ওয়াই-ফাই ব্যবহারের আগে সহজ চেকলিস্ট
পাবলিক ওয়াই-ফাইয়ে যুক্ত হওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা যেতে পারে—
নেটওয়ার্কের নাম যাচাই করুন: একই ধরনের একাধিক নেটওয়ার্কের নাম দেখা গেলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে আসল নেটওয়ার্কের নাম জেনে নিন।
অপরিচিত লগইন পেজে তথ্য দেবেন না: ওয়াই-ফাই ব্যবহারের জন্য কোনো অচেনা পেজে ইমেইল পাসওয়ার্ড, ফেসবুক পাসওয়ার্ড কিংবা ব্যাংকিং তথ্য চাইলে সঙ্গে সঙ্গে সেই পেজ থেকে বের হয়ে আসুন।
এইচটিটিপিএস পরীক্ষা করুন: গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট ব্যবহারের সময় ডোমেইন নাম এবং এনক্রিপশন—দুটিই যাচাই করুন।
সংবেদনশীল কাজ এড়িয়ে চলুন: ব্যাংকিং বা গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে পাবলিক ওয়াই-ফাইয়ের পরিবর্তে মোবাইল ডেটা ব্যবহার করুন।
অটো-কানেক্ট বন্ধ রাখুন: প্রয়োজন নেই এমন ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে ফোন যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত না হয়, তা নিশ্চিত করুন।
ফোন আপডেট রাখুন: পুরোনো নিরাপত্তা আপডেটের কারণে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ফোনের সিকিউরিটি আপডেট নিয়মিত করা প্রয়োজন।
ফ্রি ওয়াই-ফাই মানেই বিপজ্জনক নয়
পাবলিক ওয়াই-ফাই নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ারও কারণ নেই।
আধুনিক ওয়েবসাইট ও অ্যাপের অধিকাংশ যোগাযোগ এনক্রিপটেড হওয়ায় সাধারণভাবে ইন্টারনেট ব্রাউজ করার নিরাপত্তা আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের ঝুঁকি দূর হয়ে গেছে।
সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো কোনো ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ককে যাচাই ছাড়া বিশ্বাস না করা এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে নেটওয়ার্ক ও ওয়েবসাইটের সত্যতা নিশ্চিত করা।
ফ্রি ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে কয়েক মিনিট ইন্টারনেট চালালে হয়তো কিছু মোবাইল ডেটা সাশ্রয় হবে। কিন্তু ভুল কোনো নেটওয়ার্কে একবার পাসওয়ার্ড দিয়ে ফেললে তার সম্ভাব্য ক্ষতির মূল্য সেই সামান্য সাশ্রয়ের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।