
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ওপর যখন ইসরায়েলি বাহিনী ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়, ঠিক সেই মুহূর্তে ওই একই ভবনে উপস্থিত ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। অল্পের জন্য তিনি নিজে প্রাণে বেঁচে গেলেও চোখের সামনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখেছেন পুরো কার্যালয়। লেবাননভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মায়াদিনকে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে খামেনির জীবনের শেষ মুহূর্ত এবং সেই রক্তহিম করা ঘটনার বিবরণ প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এনেছেন তিনি।
টেলিভিশন চ্যানেল আল-মায়াদিনকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে আরাগচি জানান, জেনেভায় অনুষ্ঠিত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বৈঠকের অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দিতে সেদিন সকাল ঠিক ৯টার দিকে তিনি সুপ্রিম লিডারের কার্যালয়ে প্রবেশ করেছিলেন। খামেনিকে তিনি মূলত এটিই অবহিত করতে চেয়েছিলেন যে—বৈশ্বিক পরিস্থিতি এখন যে পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, তাতে একটি পুরোদস্তুর যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া ইরানের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।
সেদিনের ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে আরাগচি বলেন, তিনি যখন সুপ্রিম লিডারের কার্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে অপেক্ষায় ছিলেন, ঠিক তখনই পুরো ভবনটি লক্ষ্য করে প্রচণ্ড শক্তিশালী বোমাবর্ষণ করা হয়। তবে ভাগ্যক্রমে তিনি ভবনের যে অংশে অবস্থান করছিলেন, সেটি সরাসরি বোমার আঘাতে গুঁড়িয়ে যায়নি। চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার পর তিনি যখন কোনোমতে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়ে আসেন, তখন নিজের জীবনের চেয়েও সর্বোচ্চ নেতার নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত ছিলেন।
সেই মুহূর্তের মানসিক অবস্থার কথা জানিয়ে আব্বাস আরাগচি বলেন, "ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বের হয়ে আসার পর আমার মাথায় একটাই চিন্তা ছিল, সুপ্রিম লিডারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে কি না, তিনি নিরাপদ আছেন কি না।"
পরবর্তীতে তিনি কোনো রকমে অক্ষত অবস্থায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানোর পর খামেনির মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ও মর্মান্তিক খবরটি জানতে পারেন। সাক্ষাৎকারে তিনি আরও প্রকাশ করেন, এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর টানা ৪০ দিন তিনি নিজের বাড়ি কিংবা কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যাননি। দেশের এই চরম সংকটকালীন মুহূর্তে পুরো সময়টা তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই অবস্থান করেছেন এবং সেখান থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও কূটনৈতিক সংকট মোকাবিলার কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন।
এদিকে হামলার আগে চরম যুদ্ধাবস্থার মধ্যে খামেনিকে কোনো ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার বা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সে সময় খামেনি ঠিক কী বলেছিলেন, তার উদ্ধৃতি দিয়ে আরাগচি বলেন, "ইরানের প্রতিটি মানুষ যদি নিরাপদ আশ্রয় ও বাঙ্কারে যাওয়ার সুযোগ পায়, তবেই আমি নিরাপদ স্থানে যাব। যেহেতু বর্তমানে সেই সুযোগ সবার জন্য নেই, তাই আমিও জনগণের সঙ্গে মাটির ওপরই থাকব। আমার জনগণের ভাগ্যে যা ঘটবে, আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে।"
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, সাধারণ মানুষের প্রতি এই নিঃশর্ত ভালোবাসা ও অনড় অবস্থানই খামেনিকে ইরানিদের কাছে শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছে। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন নয়, আমাদের নেতা মানুষের হৃদয় শাসন করতেন।"
আরাগচি আরও দাবি করেন, চলমান সামরিক উত্তেজনার সময় ইরানের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও প্রতিরক্ষামূলক সিদ্ধান্ত সরাসরি খামেনির কাছ থেকেই আসত। তাঁর ভাষায়, "বাস্তবে যুদ্ধসংক্রান্ত নির্দেশগুলো সরাসরি তার পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়েছিল।"
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের হুঁশিয়ারি দিয়ে আরাগচি বলেন, তেহরানের পক্ষ থেকে যে অভাবনীয় পাল্টা জবাব দেওয়া হয়েছে, তা পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের ওপর অতর্কিত ও বড় ধরনের হামলার পর শত্রুপক্ষ মনে করেছিল তেহরান হয়তো সহজে বা দ্রুত পাল্টা আঘাত হানার শক্তি পাবে না। কিন্তু ইরান অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে ও শক্তিশালী উপায়ে মোক্ষম জবাব দিয়ে শত্রুদের সেই রণকৌশল ও দম্ভকে ভুল প্রমাণ করেছে।