
দীর্ঘ সাত সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেই দক্ষিণ ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী বান্দর আব্বাসে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এই হামলাকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করলেও, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার চূড়ান্ত মুহূর্তে এই ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মার্কিন সৈন্যদের ওপর ইরানি বাহিনীর সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, “দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বাহিনী আত্মরক্ষার্থে এই হামলা পরিচালনা করেছে। হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ঘাঁটি এবং পারস্য উপসাগরের সমুদ্রপথে মাইন পুঁতে রাখার চেষ্টায় লিপ্ত থাকা কিছু ইরানি নৌযান।”
ক্যাপ্টেন হকিন্স আরও যোগ করেন যে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড চলমান যুদ্ধবিরতির নীতি বজায় রেখেই সর্বোচ্চ সংযমের সাথে তাদের বাহিনীকে রক্ষা করার কাজ করে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বান্দর আব্বাস এবং এর আশপাশের এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা নিশ্চিত করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে ওই অঞ্চলের পরিস্থিতি ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। তবে অনানুষ্ঠানিক কিছু সূত্রে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) কয়েকজন সদস্য এই হামলায় নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত বান্দর আব্বাস ইরানের প্রধান নৌঘাঁটিগুলোর একটি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট এই হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান ভূরাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।
এই হামলাটি এমন এক সংকটময় সময়ে এলো যখন কাতারের দোহায় দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে নিবিড় আলোচনা চালাচ্ছেন। ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং সাথে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা ‘বেশ ভালোভাবে এগোচ্ছে’ বলে ইঙ্গিত দিলেও, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানান, আলোচনার একটি বড় অংশে অগ্রগতি হলেও সংঘাত নিরসনের কোনো চুক্তি এই মুহূর্তে ‘আসন্ন নয়’। একই সাথে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন কোনো তাড়াহুড়ো করবে না; তারা কেবল একটি ‘ভালো চুক্তি’ অথবা ‘কোনো চুক্তিই নয়’—এই নীতিতে এগোচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, দোহায় চলমান মূল দরকষাকষির টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে মাইন মোতায়েন বা বোটের মাধ্যমে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করছিল। মার্কিন এই আকস্মিক হামলা মূলত তেহরানের প্রতি ওয়াশিংটনের একটি কঠোর বার্তা।
নতুন করে এই সামরিক সংঘাতের ফলে মার্কিন-ইরান সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি আলোর মুখ দেখবে নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে, তা আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর নির্ভর করছে।
সূত্র : বিবিসি