
বাংলাদেশের অসংখ্য পাঠকের কৈশোর, দুপুরবেলা লুকিয়ে বই পড়া, স্কুলব্যাগের ভাঁজে গুঁজে রাখা রহস্য আর রাত জেগে শেষ করা রোমাঞ্চের নাম ছিল সেবা প্রকাশনী। মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, কুয়াশা কিংবা পশ্চিমা সাহিত্যের অনুবাদে গড়ে ওঠা সেই জগত এবার থমকে দাঁড়িয়েছে অনিশ্চয়তার সামনে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পাঠকের কল্পনার রাজ্য তৈরি করা প্রতিষ্ঠানটি হঠাৎ করেই সব কার্যক্রম সাময়িক বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
বুধবার (১৩ মে) সন্ধ্যায় প্রকাশনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক ঘোষণায় জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় নিরপেক্ষ অডিট সম্পন্ন করতে সাময়িকভাবে সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। সেবা প্রকাশনীর অন্যতম অংশীদার কাজী শাহনূর হোসেনের স্বাক্ষরিত ওই নোটিশ প্রকাশ করা হয় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায়।
ঘোষণার পর থেকেই পাঠকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে হতাশা আর আবেগের ঢেউ। নব্বই দশকের বহু পাঠকের কাছে সেবা প্রকাশনী শুধু একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং শৈশব-কৈশোরের স্মৃতির আরেক নাম। কারও কাছে স্কুল ফাঁকি দিয়ে পড়া তিন গোয়েন্দা, কারও কাছে বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখা মাসুদ রানা, আবার কারও কাছে অনুবাদ ওয়েস্টার্নের ধুলোমাখা পেপারব্যাক আজও এক টুকরো নস্টালজিয়া।
১৯৬৩ সালের মে মাসে প্রয়াত লেখক কাজী আনোয়ার হোসেনের হাত ধরে যাত্রা শুরু করেছিল সেবা প্রকাশনী। বাংলা পেপারব্যাক সাহিত্যকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে প্রতিষ্ঠানটির অবদান নিয়ে পাঠক ও সাহিত্য অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। রহস্য, থ্রিলার, গোয়েন্দা আর অনুবাদ সাহিত্যের এক বিশাল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছিল এই প্রতিষ্ঠান।
চার বছর আগে কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর প্রকাশনীর দায়িত্ব নেন পরিবারের সদস্যরা। মূলত দুই ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন ও কাজী মায়মুর হোসেন প্রকাশনীর কার্যক্রম দেখভাল করছিলেন। তবে সাম্প্রতিক ঘোষণার পর প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকাশনীর উপদেষ্টা মাসুমা মায়মুর একাধিক পোস্টে দাবি করেছেন, গত কিছু সময় ধরে তিনি আর্থিক অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন। ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের পর তার হাতে কিছু প্রাথমিক তথ্য ও প্রমাণ আসে, যা থেকে গুরুতর অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি স্বাধীন অডিট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এই বিষয়গুলো সামনে আনার পর তাকে নানা ধরনের চাপ ও জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। একই সময়ে তার স্বামী কাজী মায়মুর হোসেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। একপর্যায়ে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার প্রস্তুতিও হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। পরে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।
এত কিছুর মাঝেও সেবা প্রকাশনীকে টিকিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মাসুমা মায়মুর। পাঠকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, গুজব বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় কান না দিতে। তার দাবি, আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নতুন কাঠামোয় আবারও পাঠকদের সামনে ফিরবে সেবা প্রকাশনী।
প্রকাশনীর লেখকদের রয়্যালটি পরিশোধের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও সুসংগঠিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে হঠাৎ এই স্থবিরতার খবরে অনেক পাঠকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, শৈশবের সেই রোমাঞ্চ কি আবারও ফিরবে? বুকশেলফের পুরোনো হলদেটে কভারগুলো কি আবার নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছাবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য পাঠক তাই একটাই কথা লিখছেন, সেবা প্রকাশনীকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।